09/08/2026
ষাট ও সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত- বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের জন্মলগ্ন থেকে আজকের এই দীর্ঘ পথচলা এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তরুণ সমাজের মনে প্রতিবাদের ভাষা, অধিকারের দাবি এবং আধুনিক বিনোদনের এক নতুন স্রোত নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ব্যান্ড সংগীত।
ষাট ও সত্তরের দশক থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত- বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের জন্মলগ্ন থেকে আজকের এই দীর্ঘ পথচলা এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্বে এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে তরুণ সমাজের মনে প্রতিবাদের ভাষা, অধিকারের দাবি এবং আধুনিক বিনোদনের এক নতুন স্রোত নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছিল ব্যান্ড সংগীত।
এই ধারার জন্মলগ্নে যাঁদের হাত ধরে পথচলা শুরু হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে গুরু আজম খান ছিলেন অগ্রদূত। ১৯৭২ সালে ‘উচ্চারণ’ ব্যান্ড গঠনের মাধ্যমে তিনি পপ ও রক ঘরানার গানকে এ দেশের রাজপথ থেকে মানুষের দ্বারে পৌঁছে দেন। তাঁর কণ্ঠে ‘সালেহ উদ্দিন রোড, ট্যাক্সি ড্রাইভার’ কিংবা ‘বাংলাদেশ’-এর মতো গানগুলো কেবল গান ছিল না, বরং তা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের যুবসমাজকে পুনর্গঠিত করার এবং প্রতিবাদী করে তোলার শক্তিশালী হাতিয়ার। তাঁর হাত ধরেই মূলত এ দেশের তরুণরা গিটার কাঁধে তুলে নেওয়ার সাহস পেয়েছিল।
নব্বইয়ের দশক ছিল বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রকৃত স্বর্ণালী অধ্যায়। এই সময়ে আইয়ুব বাচ্চু, জেমস, হাসান ও বিপ্লবের মতো কিংবদন্তিরা বাংলা রক মিউজিককে এমন এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন, যার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা কেবল দেশের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছড়িয়ে পড়েছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও। শূন্য থেকে শুরু করে নিজ নিজ মেধা, নিরলস শ্রম এবং অদম্য শক্তির জোরে তাঁরা ব্যান্ডকে মূলধারার সংগীতাঙ্গনে অবিসংবাদিত আসনে অধিষ্ঠিত করেন।
সেসময় তাঁদের একেকটি অ্যালবাম বা গান রিলিজ হওয়া মানেই ছিল ভক্তদের মাঝে তীব্র উন্মাদনা। ক্যাসেটের ফিতা রিওয়াইন্ড করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গান শোনা কিংবা কনসার্টের মাঠের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষায় থাকার সেই দিনগুলো ছিল অন্যরকম। নব্বইয়ের দশক ও তার পরবর্তী সময়ে বাংলা ব্যান্ডের কনসার্টগুলোতে মানুষের যে উপচে পড়া ভিড় এবং বাঁধভাঙা উন্মাদনা দেখা যেত, তা বর্তমানের যেকোনো অনুষ্ঠানকে সহজেই ছাড়িয়ে যেত। তখন কনসার্ট মানেই ছিল এক বিশাল মিলনমেলা, মাঠ বা ইনডোর স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে চারপাশ লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। টিকিট কাটার দীর্ঘ লাইন, কনসার্টের দিন সকাল থেকেই ভেন্যুর বাইরে হাজার হাজার তরুণের অপেক্ষা, আর প্রিয় ব্যান্ড বা শিল্পীর নাম ওঠার সাথে সাথে পুরো স্টেডিয়ামজুড়ে লাখো কণ্ঠের একসঙ্গে গর্জে ওঠা, সে এক অভাবনীয় দৃশ্য ছিল।
আইয়ুব বাচ্চুর জাদুকরী গিটারের সুর, জেমসের রূঢ় অথচ মায়াবী কণ্ঠ, হাসানের আকাশছোঁয়া পাওয়ারফুল ভোকাল কিংবা বিপ্লবের প্রাণবন্ত উপস্থিতি - তাঁদের কণ্ঠে থাকা এই অভাবনীয় ভোকাল পাওয়ার শ্রোতাদের ভেতর থেকে কাঁপিয়ে দিত এবং আত্মার গভীরে গিয়ে নাড়া দিত। সত্যি বলতে, আজ যদি কেউ তাঁদের মতো সেই নিখাদ ও শক্তিশালী সুর তুলতে যায়, তবে বর্তমানের বড় বড় শিল্পীদেরও ঘাম ছুটে যাবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো--এই কিংবদন্তিদের গান শোনা বা তা উপলব্ধি করার জন্য একটি বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন হয়। এই গানগুলো কেবল কান দিয়ে শোনার বিষয় নয়; এর অন্তরালে থাকা কথা ও সুরের গভীরতা হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করার মতো মননশীলতা ও পরিপক্বতা সবার থাকে না। বর্তমানের কেউ কেউ-যাদের এই গানগুলোর মর্মার্থ বোঝার সেই মানসিক যোগ্যতা অনুপস্থিত-অনেক সময় না বুঝে বিচার করতে যায়।
যাঁরা নিজেদের পুরো জীবন দেশের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে বিলিয়ে দিয়েছেন, তাঁদের সৃষ্টি ও অবদানকে সম্মান জানানোর মানসিকতা থাকা জরুরি। একটি বিষয় স্পষ্ট যে, সস্তা কোনো ট্রেন্ড বা মুহূর্তের বিনোদন দিয়ে কখনো সেই কিংবদন্তিদের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, কনসার্টের উপচে পড়া সেই সোনালী জনস্রোত, দীর্ঘ সাধনার ইতিহাস এবং তাঁদের অমর সৃষ্টিকে ম্লান করা যাবে না। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে তাঁদের সেই নাড়া দেওয়া সুর, সংগ্রামের সোনালী ঐতিহ্য এবং প্রকৃত সঙ্গীতের ধারা সত্যিকারের সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।
#বাংলাব্যান্ড #আজমখান #আইয়ুববাচ্চু #জেমস #হাসান #বিপ্লব #নব্বইয়েরগান #রকসঙ্গীত #কিংবদন্তি #বাংলাদেশীমিউজিক #ব্যান্ডসঙ্গীত #সংগীতপ্রেমী #অমরসৃষ্টি