18/06/2026
সংযুক্ত ছবিতে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের কনস্যুলার সেবা গ্রহণের জন্য প্রবাসীদের অপেক্ষমান এলাকার ছাউনি ছিঁড়ে পড়া এবং পরবর্তীতে তা মেরামতের পর ক্ষতিগ্রস্ত অংশের চিত্র।
বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে প্রায় ৪০ লক্ষ বাংলাদেশি নাগরিকের বসবাস সৌদি আরবে, যাদের বেশিরভাগই দক্ষ/অদক্ষ শ্রমিক — নির্মাণ কাজ, মেরামত, বৈদ্যুতিক কাজের টেকনিশিয়ান, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, গাড়ি চালক, নিরাপত্তারক্ষী, স্বাস্থ্য কর্মী ইত্যাদি নানা পেশায় তাঁরা যুক্ত রয়েছেন। আর এসকল প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের রেমিট্যান্সে বেগবান হয়েছে অর্থনীতির চাকা।
তবে বিনিময়ে নিজ দেশের দূতাবাসে ব্যাসিক সার্ভিসটা পেতেও তাঁদের গলদঘর্ম হতে হয়।
অথচ স্থানীয় এক ব্যবসায়ীর বদান্যতায় রাষ্ট্রদূতের ব্যক্তিগত আড্ডা ও ধূমপানের জন্যে কাঁচঘেরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আলাদা এক কক্ষ তৈরি হয়েছে (সংযুক্ত ছবিতে দেখুন) — একদিকে রোদে পুড়ছে সাধারণ প্রবাসীরা, আর ভেতরে ঠান্ডা কাঁচঘরে আয়েশি আয়োজন করা হয়েছে ক্ষমতার ধোঁয়া ফুঁকার জন্যে — কী একটা আয়রনি তাই না?
যে দূতাবাস হওয়ার কথা ছিল প্রবাসীদের জন্যে স্বস্তির এক ঠিকানা, যেখানে তাঁদের আর কিছু না হোক একগ্লাস ঠান্ডা পানি পান করার সুবিধা ও যথাযথ বসার জায়গা, আর হাসি মুখে কনস্যুলার সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা অন্তত নিশ্চিত করা যেতো— সেখানে যাওয়ার সময় হলেই যেন রীতিমতো আতঙ্কে থাকেন সৌদি আরবে বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিকরা।
দূতাবাসের বিরুদ্ধে কেবল দুর্নীতির অভিযোগই নয়; রয়েছে ক্ষমতার ঔদ্ধত্য, চরম অব্যবস্থাপনা, কূটনৈতিক ব্যর্থতা, সাধারণ প্রবাসীদের সঙ্গে অপমানজনক ও বৈরী আচরণ এবং দূতাবাসকেন্দ্রিক ব্যবসাসিন্ডিকেটের অভিযোগ।
এসবের কেন্দ্রে রয়েছেন রিয়াদে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দেলোয়ার হোসেন। তাঁর বিষয়ে শুধু প্রবাসী বাংলাদেশিরাই নন, দূতাবাসের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তারাও অত্যন্ত নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
রাষ্ট্রদূত দেলোয়ার হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দূতাবাসে সেবার চেয়ে ‘সেটিং’ যেন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পাসপোর্ট ইস্যু, ভিসা সত্যায়ন, পাসপোর্ট ডেলিভারিসহ নানা কনস্যুলার সেবা ধীরে ধীরে এক অদৃশ্য বাণিজ্যিক জালের মধ্যে বন্দী হয়েছে।
এসব সেবায় সরকারনির্ধারিত ফির বাইরে নিয়মিত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। প্রায় ৪০ লাখ নাগরিকের জন্য প্রতিবছর লক্ষাধিক পাসপোর্ট ইস্যু ও নবায়নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী বাণিজ্যিক সিন্ডিকেট। এর খেসারত দিচ্ছেন প্রবাসীরা, আর লাভবান হচ্ছেন দূতাবাসঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী।
এমন পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। অদক্ষতা ও সমন্বয়হীনতার কারণে শীর্ষপর্যায়ের সফর বাতিল, সৌদি সামরিক কর্মকর্তাদের বাংলাদেশে প্রশিক্ষণে পাঠাতে জটিলতা, এবং সৌদি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ঘাটতি—এক কর্মকর্তার মতে, একটি ফাইলই ১০-১২ বার চালাচালি করতে হয়।
এছাড়া রিয়াদের বাইরে বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকায় কনস্যুলার সেবা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ায় হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী সময়মতো পাসপোর্ট নবায়ন করতে পারেননি, ফলে ইকামাসংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। সৌদি আইনে ইকামার মেয়াদ শেষ মানেই ভয়াবহ ঝুঁকি—চাকরি হারানোর আশঙ্কা, জরিমানা, এমনকি গ্রেপ্তার—সব কিছু মাথার ওপর ঝুলতে থাকে। ইতোমধ্যে অনেকে ১০০০-১৫০০ সৌদি রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও ভয়াবহ তথ্য এমআরপি পাসপোর্ট নিয়ে। জানা গেছে, রিয়াদ দূতাবাসে ৮০ হাজারেরও বেশি পাসপোর্ট আটকে আছে। প্রতিদিন গড়ে ২০-২৫ জন পাসপোর্ট না পেয়ে দূতাবাসেই ক্ষোভে ফেটে পড়ছেন। এই ক্ষোভ যদি একদিন গণবিস্ফোরণে রূপ নেয়, তাহলে তার দায় নেবে কে?
উদ্বেগের আরও কারণ হলো, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবে কিছু সংঘবদ্ধ বাংলাদেশি অপরাধচক্রের উদ্ভব—যারা চুরি-ছিনতাই, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি, মাদক ব্যবসা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অপহরণের সঙ্গে জড়িত। এই চক্র বাংলাদেশি নাগরিকদের টার্গেট করে অপহরণ করে ভয়াবহ নির্যাতনের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। মুক্তিপণ না পেলে কেউ হত্যার শিকার হন, কেউ গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েন, এমনকি কারও কোনো সন্ধানই মেলে না।
এসব গুরুতর ঘটনায় বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন প্রয়োজন ছিল, কিন্তু তেমন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি—দাবি দূতাবাসের পদস্থ কর্মকর্তাদের। তাঁদের অভিযোগের তীরও ওই রাষ্ট্রদূতের প্রতিই।
আশা করছি, উল্লিখিত বিষয়গুলো আমলে নিয়ে সরকার এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখবে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
#সৌদি #প্রবাসী #বাংলাদেশ #কনসুলেট #সৌদি #আরব
Cp
Zulkarnain Saer