24/09/2012
নিরাপত্তাহীন মহাসড়ক
লেখক: পিনাকিদাসগুপ্ত | সোমবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১২, ৯ আশ্বিন ১৪১৯
ডাকাতি ছিনতাই চাঁদাবাজিতে জিম্মি পরিবহন ব্যবসা
দেশের মহাসড়কগুলোতে ছিনতাই, ডাকাতি বেড়ে যাওয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন যানবাহনের চালক ও মালিকরা। পণ্য বোঝাই করে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত চালকদের মনে এক অজানা আশংকা ভর করে থাকে। এই বুঝি দুর্বৃত্তরা খালি ট্রাক বা এরকম কিছু দিয়ে পথরোধ করে সাক্ষাত্ বিভীষিকার মত সামনে এসে দাঁড়াবে। তারা অস্ত্রের মুখে চালক ও হেলপারকে নামিয়ে দিয়ে ট্রাক অথবা কাভার্ড ভ্যানটি নিয়ে যাবে। এমনকি দরকার মনে করলে তারা প্রাণটাও কেড়ে নিতে পারে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হক মন্টু বলেন, এসব তো আছেই এর সঙ্গে মহাসড়কে রয়েছে পুলিশের নানা হয়রানি ও চাঁদাবাজি। এ নিয়ে পুলিশ প্রশাসনকে বারবার জানানোর পরও কোন প্রতিকার মেলেনি। ফলে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যারা জড়িত তারা কেউই ভাল নেই।
হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি হুমায়ুন কবির অবশ্য বলেছেন ভিন্নকথা। তিনি বলেন, মহাসড়কে ছিনতাই ডাকাতি আগের তুলনায় অনেকটা কমেছে। হাইওয়ে পুলিশের পর্যাপ্ত জনবল ও যানবাহন না থাকা সত্ত্বেও টহল সাধ্যমত জোরদার করা হয়েছে। ছিনতাই ডাকাতি কমিয়ে আনতে হাইওয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও চালকদের কিছু কিছু দিক-নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। হাইওয়ে পুলিশের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে ডিআইজি বলেন, চাঁদাবাজি হয় না এমন দাবি তিনি করবেন না। তবে আগের মত নগ্নভাবে হয় না। আর যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তাদের বিরুদ্ধে তাত্ক্ষণিকভাবেই বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, মহাসড়কের নিরাপত্তায় হাইওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশও দায়িত্ব পালন করে থাকে।
বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির নেতা মাসুম পাটোয়ারী বলেন, মহাসড়কে বিশেষ করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন ব্যবসায়ীরা ডাকাত ও চাঁদাবাজদের হাতে জিম্মি। পণ্য আনা-নেয়ার পথে প্রায়ই ডাকাতদের হাতে লুট হচ্ছে মালবোঝাই ট্রাক কিংবা কাভার্ড ভ্যান। গত দুই মাসে কমপক্ষে কয়েক কোটি টাকার পণ্য ডাকাতি হয়েছে। অন্য দিকে পথে পথে চলছে হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক সার্জেন্টদের বেপরোয়া চাঁদাবাজি। চাঁদা না দিলে পণ্যবোঝাই ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। পরে বাধ্য হয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা দিয়ে পার পেতে হয়। তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে গার্মেন্টস পণ্যের চালান লুটের ঘটনাই বেশি।
তিনি বলেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদার ও ঝুঁকি এড়াতে করণীয় সম্পর্কে গত ২৫ জুন পুলিশ সদর দফতরে পণ্য পরিবহন সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোর ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কিন্তু কোন কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।
ঢাকা মহানগর পণ্য পরিবহন এজেন্সি মালিক সমিতির নেতা দোলন কান্তি বড়ুয়া বলেন, সাভার, ধামরাই, আশুলিয়া সড়ক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মাওয়া সড়ক, কাঁচপুর, চৌদ্দগ্রাম, মহাখালী ফ্লাইওভার, বনানী রেলক্রসিং, আরিচা মহাসড়ক, হাইকোর্ট মাজার সংলগ্ন সড়কে গাড়ি হাইজ্যাক ও ত্রিপল কাটার ঘটনা ঘটে চলেছে। পুলিশ প্রশাসনকে বিষয়টি বার বার বলার পরও এসব এলাকার নিরাপত্তায় কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কয়েক মাস আগে ধর্মঘট করে পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। পরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্বাসে তারা ধর্মঘট প্রত্যাহার করেন। তবে এভাবে চলতে থাকলে কোরবানী ঈদের পরই পণ্য পরিবহন এজেন্সিগুলো আবার ধর্মঘটে যাবে বলে তিনি জানান।
ডাকাতির - ছিনতাই স্পট
সূত্র জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নব্বইভাগ ডাকাতিই হয় কুমিল্লার মেঘনা এলাকায়। এছাড়া সীতাকুন্ড, মীরসরাই, বড়দারোগাহাট, ফেনী, চৌদ্দগ্রাম, মুগড়াপাড়া ও কাঁচপুর এলাকায়ও অহরহ ডাকাতি হচ্ছে। এসব এলাকায় ডাকাতরা সুকৌশলে পণ্যবাহী গাড়ি থামিয়ে পণ্য লুট করে। বেশিরভাগ সময় গাড়িও নিয়ে যায়। কখনো কখনো কার্টন খুলে ভেতর থেকে অর্ধেক পণ্য নিয়ে কার্টনগুলো আবার আগের মতো সাজিয়ে রাখে। এসব ঘটনার সঙ্গে সাধারণত কিছু চালকও জড়িত রয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক ডজনের মত ডাকাত গ্রুপ রয়েছে। সূত্র আরও জানায়, ডাকাতদের শনাক্ত করা গেলে মালামাল উদ্ধারের নামে ডাকাত ও পণ্য মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এক শ্রেণীর পরিবহন নেতা। এরপর ডাকাতি হওয়া পণ্যের মূল্যকে তিন ভাগে ভাগ করে এক ভাগ পরিবহন মালিক, একভাগ পণ্য মালিকের ক্ষতিপূরণ ও একভাগ ডাকাতদের দিয়ে সমঝোতা করা হয়ে থাকে। এই পরিবহন নেতারা নেপথ্যে থেকে ডাকাতদের অংশে ভাগ বসায়।
উদ্ধার করা যায়নি
গত ১২ আগস্ট পুরানো ঢাকার আরমানিটোলা থেকে সবুজ ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির একটি ট্রাকে (ঢাকা মেট্রো-ট-১৪-২২৬৬) রাজবাড়ী যাওয়ার পথে ছিনতাই হয়। ট্রাকে ছিল ৫০ লাখ টাকা মূল্যের পণ্য। গত ৯ সেপ্টম্বর ধোলাইখাল থেকে স্বপন ট্রান্সপোর্টের একটি ট্রাক (ঢাকা মেট্রো-ট-১৪-০৪৪৭) ৬০ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে রাজশাহী যাচ্ছিল। রাত দেড়টার দিকে আরিচা মহাসড়কের সাহারা পেট্রোল পাম্পের সামনে ছিনতাই হয়। দুর্বৃত্তরা ট্রাকের চালক ও হেলপারকে মারধর করে নামিয়ে দিয়ে ট্রাক নিয়ে পালিয়ে যায়। পুলিশ গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে ট্রাকটি খালি ও পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। গত ৭ জুলাই ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সাভার ডেইরি ফার্ম এলাকায় চালভর্তি একটি ট্রাক ছিনতাই হয়। গত ২৯ এপ্রিল নওগাঁ থেকে চালভর্তি একটি ট্রাক চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে গাজীপুর এলাকা থেকে ছিনতাই হয়। গত ২২ মে রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় লোহার রড ভর্তি একটি ট্রাক ছিনতাইয়ের পর ছিনতাইকারীরা চালকের সহকারীকে চলন্ত ট্রাকের নিচে ফেলে হত্যা করে। গত ২১ সেপ্টম্বর ভোরে শিশুপার্কের সামনে থেকে সবুজ ট্রান্সপোর্টের একটি ট্রাক ( ঢাকা মেট্রো- ট-১৪-৩২৫২) ছিনতাই হয়। ২০/২৫ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের পণ্য নিয়ে ঢাকা থেকে ট্রাকটি মাদারীপুর যাচ্ছিল। ট্রাকটি রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ