20/10/2026
সমাজ পরিবর্তনের কথা বললে অনেকে অসন্তুষ্ট হন, কিন্তু পরিবর্তনের জন্য সত্য কথাগুলো বলাও জরুরি।
জীবনের পথচলায় বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে একটি বিষয় উপলব্ধি করেছি—ভালো কিছু করার ইচ্ছা থাকলেই সবাইকে সন্তুষ্ট রাখা যায় না। কখনো সত্য কথা বলতে হয়, কখনো ভুলের সমালোচনা করতে হয়, আবার কখনো নিজের অবস্থান থেকে মানুষের কল্যাণে উদ্যোগ নিতে হয়। আর এসব করতে গিয়েই অনেকের ভালোবাসা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি কারও কারও বিরাগভাজনও হতে হয়।
আমার পথচলাটা শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবনের একটা সময় সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গেও যুক্ত ছিলাম। সে সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। কাছ থেকে দেখেছি মানুষের প্রত্যাশা, সমস্যার বাস্তবতা, দাপ্তরিক সীমাবদ্ধতা এবং সমাজের নানা অসংগতি।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষার পরিবেশ, প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দায়িত্ব সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে পথ চলতে গিয়ে মতাদর্শ, নেতৃত্ব, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই দেখেছি। পাশাপাশি সামাজিক সংগঠন গড়ে তোলা, উদ্যোগী মানুষকে একত্র করা এবং মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগে সহযোগিতা করার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। এসব উদ্যোগের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা অনেক সংগঠন এখনো তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জীবনের আরেকটি বড় শিক্ষা পেয়েছি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কষ্ট, রাস্তায় প্রতিবাদরত মানুষের দাবি, জীবিকার সংগ্রাম এবং বাস্তব জীবনের নানা অভিজ্ঞতা আমাকে বারবার ভাবিয়েছে—সমাজের পরিবর্তন শুধু বক্তব্যে আসে না; পরিবর্তন আনতে হয় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে, সমস্যা বুঝে এবং সমাধানের চেষ্টা করে।
আমি নিজেও খুব সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা একজন মানুষ। তাই মানুষের অবস্থান, সীমাবদ্ধতা ও সংগ্রামকে দূর থেকে বিচার করার পরিবর্তে নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি।
এই দীর্ঘ পথচলায় আমার উপলব্ধি হয়েছে, শিক্ষা, রাজনীতি, প্রশাসন কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ড—কোনো ক্ষেত্রই গঠনমূলক সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তবে সমালোচনা হতে হবে তথ্য, যুক্তি, নীতি ও শালীনতার ভিত্তিতে। উদ্দেশ্য কাউকে হেয় করা নয়, বরং ভুল চিহ্নিত করে সংশোধনের পথ তৈরি করা।
শিক্ষার দুর্বলতা নিয়ে কথা বললে শিক্ষককে শত্রু ভাবা, প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললে ব্যক্তিগত আক্রমণ মনে করা, রাজনৈতিক মতের অমিলকে বিরোধিতার একমাত্র কারণ বানানো কিংবা সামাজিক সমস্যার কথা বললে বক্তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা—এসব মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
আমারও ভুল হতে পারে। আমার বক্তব্যের সঙ্গে কারও দ্বিমত থাকতে পারে। আমি চাই, সেই দ্বিমত প্রকাশিত হোক যুক্তি দিয়ে, তথ্য দিয়ে এবং শালীনতার সঙ্গে। ভুল করলে আমাকে সংশোধন করুন, কিন্তু ভালো উদ্যোগের মূল্যায়ন যেন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ওপর নির্ভর না করে।
রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য থাকবে, নেতৃত্ব নিয়ে ভিন্নমত থাকবে, সময়ের সঙ্গে অবস্থান ও পরিস্থিতির পরিবর্তনও আসবে। কিন্তু এসবের ঊর্ধ্বে আমাদের ন্যায়, নৈতিকতা, মানুষের মর্যাদা এবং জনকল্যাণের প্রশ্নকে স্থান দিতে হবে।
আমার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়; বরং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে সমাজের অসংগতিগুলো তুলে ধরা, মানুষকে ভাবতে উৎসাহিত করা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের পথে সামান্য হলেও ভূমিকা রাখা।
সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন, এমন প্রত্যাশা করি না। তবে এটুকু প্রত্যাশা করি—আমরা যেন ব্যক্তির পরিবর্তে বিষয় নিয়ে আলোচনা করি, আবেগের পরিবর্তে যুক্তিকে গুরুত্ব দিই এবং বিরোধিতার পরিবর্তে সমাধানের পথ খুঁজি।
কারণ, সমাজের জন্য কাজ করতে হলে শুধু প্রশংসা পাওয়ার মানসিকতা থাকলে চলবে না; সমালোচনা শোনার সাহসও থাকতে হবে। একইভাবে সমালোচনা করতেও দায়িত্ববোধ, সততা ও আত্মসমালোচনার মানসিকতা থাকা জরুরি।
আমি বিশ্বাস করি, পরিবর্তন শুরু হয় নিজের ভেতর থেকে। ব্যক্তি বদলালে পরিবার বদলায়, পরিবার বদলালে সমাজ বদলায়, আর সচেতন সমাজই একটি সুন্দর রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি তৈরি করে।
আসুন, কে কোন মতের মানুষ—শুধু তা দিয়ে নয়; কে কতটা ন্যায়ের পক্ষে, কে মানুষের কল্যাণে কাজ করছে এবং কে নিজের ভুল সংশোধনে প্রস্তুত—সেই বিবেচনায় মানুষকে মূল্যায়ন করি।
আমার পথচলা অব্যাহত থাকুক নীতি, সততা, শালীনতা ও মানুষের কল্যাণের প্রত্যাশায়। মতের অমিল থাকুক, কিন্তু পারস্পরিক সম্মান যেন হারিয়ে না যায়। সমালোচনা থাকুক, তবে তা হোক সংশোধনের জন্য; বিরোধ নয়, হোক পরিবর্তনের প্রেরণা।
কারণ, ব্যক্তিগত বিরাগের চেয়ে সমাজের কল্যাণ বড়, আর সাময়িক অসন্তুষ্টির চেয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুন্দর ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
#সমাজপরিবর্তন #শিক্ষা #সামাজিকদায়বদ্ধতা #গঠনমূলকসমালোচনা #জনকল্যাণ