12/08/2026
বাংলাদেশি ফ্রান্স নাগরিকের সাথে প্রবাসী আব্দুল মজিদ চাচার মেয়ের বিয়ে ভেংগে গেলো!
আমাদের কাছে ফোন এলো সৌদি প্রবাসী আব্দুল মজিদ চাচার। এবার তিনি তার বড় মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিলেন। একই সাথে মেয়ের হবু বরের তথ্য যাচাই করতে সহায়তা চাইলেন।
প্রবাসী আব্দুল মজিদ চাচা জানালেন পাত্র ফান্সে গেছে ৮ মাস আগে এখন সে ফ্রান্সের নাগরিক। পাত্রের নাম বনি আমিন। ফ্রান্সে সে যেখানে চাকরি করে, সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ পদে আছে। তাই মালিক তাকে চাইলেই এখন ছুটি দেবে না। এই কারণে পাত্র পক্ষের প্রস্তাব হলো—টেলিফোনেই এখন বিয়েটা হোক। পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে ছেলে দেশে এসে ধুমধাম করে মেয়েকে তুলে নিয়ে যাবে। আর মেয়ের ডকুমেন্ট রেডি হলে ফ্রান্সেও নিয়ে যাবে।
যাচাই করার জন্য আব্দুল মজিদ চাচা আমাদের কাছে পাত্র বনি আমিনের পাসপোর্ট ছবি সহ তথ্য দিলেন।
এবার বাংলা এভিয়েশনের অনুসন্ধানের পালা শুরু।
ফ্রান্সের গিয়ে ৮ মাসেই নাগরিকত্ব পেয়েছে শুনেই বুঝলাম কোন কিন্তু আছে।কারণ ফ্রান্স ৮/১০ মাসে কাউকে নাগরিকত্ব দেয় না। মজিদ চাচা আমাদের ৩টি ছবি দিয়েছেন।একটি ছেলের ছবি। ২য়টি ফ্রান্সের লাল পাসপোর্ট হাতে ছবি। ৩য় টি পাসপোর্ট এর কভার এর ছবি।
অনুসন্ধান করে আমরা যা পেলাম তা আমরা প্রবাসী আব্দুল মজিদ চাচাকে জানালাম। চাচার আকাশ ভেঙে পড়লো। তিনি সিদ্ধান্ত নিলে বনি আমিনের সাথে মেয়ে বিয়ে দিবেন না।
প্রবাসী আব্দুল মজিদ চাচার মতো অনেকেই এই ইস্যুতে জানতে চান। অনেকের মধ্যে বিভ্রান্ত আছে। এই বিষয়ে পরিষ্কার করতে আমরা বিস্তারিত তুলে ধরলাম।
শুরুতেই যেটা বললাম ফ্রান্স ৮/১০ মাসে কাউকে নাগরিকত্ব দেয় না। মূলত বনি আমিন ফ্রান্সে গিয়ে আশ্রয় চেয়েছেন যেটা এসাইলাম হিসেবে বেশি পরিচিত।
বনি আমিন ফ্রান্সের কোনো নাগরিক নন। "বাংলাদেশে সে নিরাপদ নয়" উপস্থাপন করে ফ্রান্সে আশ্রয় ছেড়েছেন। বাংলাদেশিরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক হুমকির আশ্রয় চায়। বিএনপির আমলে আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে। আর আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপি জামাত কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে। নন মুসলিমরা সং্খ্যালঘু হিসেবে নিরাপদ নয় উপস্থাপন করে আশ্রয় চায়। আবার অনেকেই সমকামী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন।
এরকম আবেদনকারীদের ফ্রান্সে সরকার শরণার্থী বা রিফুজি (Refugee) হিসেবে আশ্রয় দেয়। তাদের হুমকির তথ্য যাচাই বাছাই করে।
জাতিসংঘের শরনার্থী নীতি অনুসারে ফ্রান্সে শরণার্থীদের 'ট্রাভেল ডকুমেন্ট' দেওয়া হয়, সেটি দেখতে ফ্রান্সের সাধারণ নাগরিকদের জন্য ইস্যুকৃত পাসপোর্টের মতোই লাল রঙের। আর তাদের বাংলাদেশি পাসপোর্ট জমা রাখা হয়।
লাল ট্রাভেল ডকুমেন্টস দেখে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। অনেকেই সেটিকে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পাবার পর পাসপোর্ট হিসেবে উপস্থাপন করেন।
প্রবাসী আব্দুল মজিদ চাচার ক্ষেত্রেও ঠিক এই বিভ্রান্তিই হয়েছিল।
ফ্রান্স নাগরিক ছেলে কেন টেলিফোনে বিয়ে করতে চায়?
উত্তর হচ্ছে -ফ্রান্সে আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তিদের ফরাসি সরকার যে ‘ট্রাভেল ডকুমেন্ট’ (Travel Document for Refugees) দেয়, সেটির বিশ্বের অনেক দেশেই ভ্রমণ করা সম্ভব। তবে সেটি দিয়ে বাংলাদেশে যাওয়া যাবে না।কারণ পাসপোর্টধারী তো বলেছেন- সে বাংলাদেশে নিরাপদ না।
যেহেতু ওই ব্যক্তি নিজেই প্রমাণ করেছেন যে তিনি বাংলাদেশে নিরাপদ নন, তাই ফরাসি সরকার বা ওই ট্রাভেল ডকুমেন্ট তাকে কখনোই বাংলাদেশে যাওয়ার অনুমতি দেবে না। আর যদি তিনি কোনোভাবে লুকিয়েও যান, তবে ফ্রান্সে তার অর্জিত আশ্রয়ের অধিকার ও স্ট্যাটাস চিরতরে বাতিল হয়ে যাবে।
মালিক ছুটি দিচ্ছে না বা কোম্পানির বড় দায়িত্ব—এগুলো সব বনি আমিনের সাজানো গল্প ও অজুহাত মাত্র। আসল সত্যি হলো, সে ভালো করেই জানে যে শরণার্থী ট্রাভেল ডকুমেন্ট নিয়ে তার পক্ষে বাংলাদেশে যাওয়ার কোনো আইনি সুযোগই নেই। সে চাইলেও নিজের দেশে পা রাখতে পারবে না। নিজে দেশে এসে বিয়ে করার কোনো উপায় নেই জেনেই সে এখন সুকৌশলে ‘টেলিফোনে বিয়ে’-র এই ফাঁদ পেতেছে।
ফ্রান্সের শরণার্থী' ট্রাভেল ডকুমেন্ট চেনার সহজ উপায়
সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রায়ই দেখবেন ফ্রান্সের পাসপোর্টের ছবি আপলোড করা হয়। কিন্তু একটা মজার বিষয় লক্ষ্য করবেন। ছবিগুলোতে পাসপোর্টের ঠিক নিচের অংশটি প্রায়শই হাত বা অন্য কোনো কিছু দিয়ে ঢাকা থাকে।
কেন জানেন? কারণ আসল সত্যটা ঠিক ওই ঢাকা অংশেই লুকিয়ে আছে।
আমরা এখানে ফ্রান্সের একটি 'শরণার্থী ট্রাভেল ডকুমেন্টের' (Titre de Voyage pour Réfugié) কভার পেজের ছবি দিয়েছি।
নিচের অংশে কী লেখা আছে।
ফরাসি নাগরিকদের পাসপোর্টের নিচে শুধু 'Passeport' লেখা থাকে।
কিন্তু এই ডকুমেন্টের নিচে ফরাসি ভাষায় খুব স্পষ্ট করে লেখা রয়েছে দুটি তথ্য।
প্রথমে লেখা TITRE DE VOYAGE" (ভ্রমণ দলিল)
এবং তার ঠিক নিচে— "POUR RÉFUGIÉ" (শরণার্থীর জন্য)।
সহজ কথায়, এটি কোনো পাসপোর্ট নয়, বরং এটি একটি আন্তর্জাতিক সনদের অধীনে শরণার্থীদের দেওয়া ভ্রমণের অনুমতিপত্র।
আর এই কারণেই আসল পরিচয় লুকাতে অনেক সময় পাসপোর্টের নিচের ওই অংশটি ঢেকে ছবি তোলা হয়, যাতে সবাই মনে করে এটি একটি সাধারণ ফরাসি পাসপোর্ট। তাই এখন থেকে এমন ছবি দেখলে সতর্ক হোন এবং পুরোটা দেখার চেষ্টা করুন।
#বাংলাএভিয়েশন