06/20/2025
''প্রথম আলো ''
-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
রবীন্দ্রনাথের প্রেরণাদাত্রী কাদম্বরী দেবীর স্মৃতির উদ্দেশ্যে রচিত প্রথম আলো উপন্যাসের মূল রস রবি বাবুকে ঘিরে হলেও সমান্তরাল একটি চরিত্র - যদি সংজ্ঞা হিসেবে বলি, 'গল্পের শুরু থেকে শেষ অবধি যে বিস্তৃত আছে সেই গল্পের নায়ক ' - তবে সে হিসেবে ''ভরত ''এই উপন্যাসে আলাদা রসের সৃষ্টি করেছে।
গল্পের শুরুতে আপনি ঘুরে বেড়াবেন রাজা বীরচন্দ্র মানিক্যের বিশাল ত্রিপুরা রাজ্যে। সেকালের ধনী খামখেয়ালি রাজার অগনিত স্ত্রী/ রক্ষিতা থাকা সত্বেও বুকে হাহাকার করে উঠবে -যখন শুধুমাত্র মহারাজ নির্ধারিত সময় তার মানাঘর ছেড়ে রাত কাটাতে রানীর কাছে আসেন নি - এই অভিমানে চল্লিশোর্ধ পাটরাণী নিজের আত্মাহুতি দেন তখন। আর রানীর বিরহে প্রৌঢ় রাজামশাই যখন পাগলপ্রায় হয়ে রাজ্য-চিন্তা ছেড়ে প্রেমকাতর হয়ে ওঠেন, নির্মল প্রেমের হাহাকারে পাঠক ভেসে যায়। ঠিক তার কিছু পরেই তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রাণ জুড়ানো 'ভগ্নহৃদয় '' এর পংক্তি পড়ে স্বাভাবিক হয়ে ওঠেন রাজামশাই।
পুরো উপন্যাসে বুঁদ হয়ে গেলে যে কেউ প্রেমে পড়ে যাবে সে সময়ের নারী হৃদয়ের স্পন্দন সৃষ্টিকারী তরূণ কবি রবির। তার সুঠাম দেহ, স্নিগ্ধ ব্যবহার, ঝরঝরে কন্ঠ, আর তার হাতের সৃষ্টিতে নারীমন বারবার প্রেমে পড়তে বাধ্য। এর আগে রবির এত কাছে কেউ গিয়েছে বলে মনে হয় না। নতুন বৌঠানের রবির কাছে 'হেকেটি ' হয়ে ওঠা , তার সাথে প্রতিটা প্রথম সৃষ্টি ভাগ করে নেয়া থেকে শুরু করে, কাদম্বরীর আত্মঘাতিনী হয়ে ওঠার পেছনের গল্পগুলোকে বাস্তবরূপে চোখের সামান্য দেখতে পাওয়া যাবে। বইটির পাতা উল্টানোর সাথে সাথে আপনি টের পাবেন আপনি হেঁটে বেড়াচ্ছেন জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে কিংবা চন্দননগরের জ্যোতিরিন্দ্রের বাড়িতে রবি আর কাদম্বরীর পাশাপাশি ।
গল্পের ধারায়, রবীন্দ্রনাথ এর জীবন প্রবাহে তাঁর সময়কালের নানান উল্লেখযোগ্য ব্যক্তির দেখা মিলবে, জানা যাবে তাদের জীবনের অজানা গল্পগুলোয়, মিশে যাবেন তাদের সময়ে । বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ রধের প্রতিকূলতা, রামমোহন রায়ের সতীদাহপ্রথা আইন পাশ, নরেন্দ্র থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠা , গান্ধীজির কথা, বিদ্যাসাগরের সাথে বঙ্কিমের ঠান্ডা যুদ্ধ, ভারতী পত্রিকার জীবনযাত্রা, বাংলা নাটকের জন্ম ইতিহাস সহ তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত সমাজের প্রতিটা ঘটনা নিজের চোখের সামনে ঘটতে দেখবেন বইটি হাতে নিয়ে।
নির্মম প্রনয়নের পরিচয় পাওয়া যায় দ্বারিকা নামে ভরতের বন্ধুর সাথে বসন্ত-মঞ্জরী নামে এক পতিতার প্রেমে, হৃদয় ছেঁড়া সে প্রেম অনেক উত্থান পতনের পরে অবশেষে পায় সফলতা।।
আর ভরত? রাজার ছেলে হয়েও যাকে প্রাণ নিয়ে পালাতে হয়েছিল রাজ্য ছেড়ে। সারাটা জীবন যাকে তাড়া করে ফিরেছে জন্মের প্রশ্ন, মৃত্যু ভয় আর ভূমিসুতার ভালবাসাকে গ্রহণ করতে না পারার কাপুরষতা।
নির্মমতার সম্মুখিন হতে হয় যখন ভরতকে ভালবেসে সব ছাড়তে বসা ভূমিসুতাকে একই সাথে পেতে চায় দু জন - ত্রিপুরার রাজা এবং ভরতকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা ভরতের শিক্ষক শশীভূষণ। পিতৃ-মাতৃহীন মেয়ে ভূমিসুতা গল্পের নায়িকা- যে তার সমস্ত মন- প্রাণ দিয়ে ভালবেসেছিল রাজার রক্ষিতা, কাছুয়ার ছেলে ভরতকে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম কঠিন ঢেউ এসে তার জীবনকে ছন্নছাড়া করে দিয়েছিল। ভুমিসুতা কার হবে শেষ পর্যন্ত? শশিভূষণের? নাকি রাজা জোর করে আদায়করে নেবে ভুমিসূতাকে? নাকি পাঠকের মনকে সিক্ত করে ভুমিসূতা অবশেষে ফিরে পাবে তার ভালবাসাকে? নাকি এই পৃথিবীর যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে সে বিদায় নেবে সবার কাছ থেকে.....?
পড়তে শুরু করুন বইটি...
প্রিয় কে?? ২১ বছরের রবি, রবি, রবি।।
বইটিতে হৃদয় মোচড়ানো প্রেম উপভোগ করা যাবে নানান চরিত্রের মধ্যে দিয়ে। নারীর মন আর শরীর নিয়ে অনেকগুলো প্রিয় লাইন থাকলেও এখানে উপস্থাপন করার জন্যে নরেন্দ্রের একটা উক্তিই বলতে চাই-
'' এ জীবন ত রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া একটা জিনিস নয়, দুর্লভ এই মানবজন্ম, এর সার্থকতার পথ অন্বেষণ করা, চিত্তবৃত্তি বিকাশের জন্য যত্নবান না হয়ে গড্ডালিকা স্রোতে গা ভাসিয়ে দিলে পশুর সঙ্গে তফাত রইল কি! ''
Nushrat Niva