08/10/2026
আজ, ৮ অক্টোবর ২০২৬, বাংলাদেশ সরকার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক –এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫ বছরের কনসেশন চুক্তি সই হয়েছে।
চুক্তিতে মূলত কী আছে
NCT-এর মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। DP World ১৫ বছর টার্মিনাল পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব পালন করবে। মেয়াদ শেষে টার্মিনাল এবং অর্জিত প্রযুক্তিগত জ্ঞান-দক্ষতা বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের কথা রয়েছে।
সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
DP World প্রায় ১৫ কোটি মার্কিন ডলার নতুন বিনিয়োগ করবে।
পুরোনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন, ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন ও টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
চুক্তির সময় বাংলাদেশ প্রায় ৫ কোটি ডলার এককালীন অর্থ পাবে।
NCT বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালনা করে—অর্থাৎ এটি বন্দরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিতে বাংলাদেশের আর্থিক আয়, রাজস্ব এবং বন্দর শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয় রাখা হয়েছে।
তবে বিতর্কটা কোথায়?
এই চুক্তিকে সরকার দেখছে আধুনিক প্রযুক্তি, দ্রুত পণ্য খালাস, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আনার উদ্যোগ হিসেবে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ এবং বন্দর রক্ষা আন্দোলন বিদেশি অপারেটরের কাছে NCT পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছে। তারা চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে এবং বন্দর অচল করার কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছে।
অর্থাৎ এখানে মূল প্রশ্ন শুধু “বিদেশি কোম্পানি আসছে কি না” নয়; বরং প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ এই ১৫ বছরে কতটা আর্থিক সুবিধা পাবে, বন্দর কতটা দক্ষ হবে, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কতটা নিরাপদ থাকবে এবং চুক্তির শর্তগুলো কতটা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হবে।
প্রবাসীদের চাওয়া-পাওয়া
প্রবাসী বাংলাদেশিদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রবাসীরা বিদেশে কাজ করে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান, আর সেই অর্থ দেশের আমদানি-রপ্তানি ও বৈদেশিক লেনদেনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তাদের প্রত্যাশা হওয়া স্বাভাবিক—চট্টগ্রাম বন্দর যেন দ্রুত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের একটি বন্দর হয়ে ওঠে।
প্রবাসীদের প্রত্যাশাগুলো এভাবে তুলে ধরা যায়:
১. বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে হবে
জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ও রপ্তানি পণ্য জাহাজে ওঠাতে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে হবে। বন্দর দ্রুত হলে ব্যবসার খরচ কমবে, যার সুফল শেষ পর্যন্ত দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে।
২. আমদানি-রপ্তানির খরচ কমাতে হবে
শুধু বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করলেই হবে না। কনটেইনার পরিবহন, কাস্টমস, সড়ক ও রেল যোগাযোগ—পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে আধুনিক করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেল ও ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোর সংযোগ উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও এসেছে।
৩. চুক্তির আর্থিক হিসাব জনগণের সামনে পরিষ্কার হওয়া দরকার
প্রবাসীদের একটি বড় প্রত্যাশা হতে পারে—১৫ বছরে বাংলাদেশ মোট কত টাকা/রাজস্ব পাবে, প্রতি কনটেইনারে কত আয় হবে, DP World কী পরিমাণ বিনিয়োগ করবে এবং বাংলাদেশের ব্যয়-সুবিধার হিসাব কী—এসব তথ্য যেন যথাসম্ভব জনসমক্ষে থাকে।
৪. বন্দরের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিরাপদ রাখতে হবে
আধুনিকায়নের নামে যেন অভিজ্ঞ বাংলাদেশি শ্রমিক-কর্মচারীরা হঠাৎ চাকরি হারান—এমন আশঙ্কা থাকা উচিত নয়। বরং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে উচ্চপদে কাজের সুযোগ তৈরি করা জরুরি। চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্যেও স্থানীয় workforce ও skills development-এর কথা বলা হয়েছে।
৫. দেশের স্বার্থকে দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করতে হবে
১৫ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। তাই আজকের আর্থিক লাভের পাশাপাশি ১৫ বছর পর বাংলাদেশ কী পাবে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার জ্ঞান যেন দেশে স্থায়ীভাবে থেকে যায়, প্রবাসীরা সেটিই দেখতে চাইবেন।
৬. বন্দরের উন্নয়ন যেন সাধারণ মানুষের জীবনেও প্রভাব ফেলে
বন্দর আধুনিক হলেও যদি পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় ও ব্যবসার খরচ না কমে, তাহলে সাধারণ মানুষ সুফল কতটা পেল—সে প্রশ্ন থেকেই যাবে। তাই বন্দরের উন্নয়নের সুফল যেন ব্যবসায়ী থেকে ভোক্তা এবং শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছায়।
প্রবাসীদের পক্ষ থেকে মূল বার্তা
“আমরা চাই চট্টগ্রাম বন্দর বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যের শক্তিশালী দরজা হোক। কিন্তু ১৫ বছরের এই চুক্তির প্রতিটি সুফল যেন বাংলাদেশের জনগণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও প্রবাসীদের অর্থনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগে। বিদেশি প্রযুক্তি ও দক্ষতা আসুক, কিন্তু তার সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ, স্বচ্ছতা, শ্রমিকের অধিকার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ সুরক্ষিত থাকুক।”
সরকার বলছে চুক্তিটি বাংলাদেশের মালিকানা বা সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তর করছে না; অন্যদিকে বিরোধিতাকারীরা চুক্তির প্রয়োজনীয়তা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে চুক্তির পূর্ণ শর্ত, আর্থিক কাঠামো, কর্মসংস্থান নীতি ও কর্মদক্ষতার সূচকগুলো কতটা স্বচ্ছভাবে বাস্তবায়িত হয়।