15/08/2026
বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে ২০টি ডিজেলচালিত লোকোমোটিভ অনুদান দিতে আগ্রহী হয়েছিল বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী চীন। দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে ২০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) অনুদান হিসেবে দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে চীন।
রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চীনের পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব পাওয়ার পর ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার এবং ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে আনার প্রক্রিয়া ও কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে উভয় দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা চলে। কিন্তু ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তবর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিলে বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম সহযোগী দেশ চীনের সঙ্গে এই প্রকল্প নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। পরবর্তী সময়ে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলেও এটা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা না হওয়ায় চীন প্রকল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।
বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানানো হয়েছে, চীনের অনুদানে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের লক্ষ্যে প্রকল্পের পিডিপিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। এছাড়া পিডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ১৮৩৫৩৭.৯১ লাখ টাকা (জিওবি ৪৪০০.০৪ লাখ টাকা, প্রকল্প অনুদান ১৫৯১৩৭.৮৭ লাখ টাকা ও বাস্তবায়ন মেয়াদ ১ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত ধরা হয়েছিল)।
রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ২০টি ইঞ্জিন কেনার জন্য যে ১ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয় ধরেছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে ইঞ্জিন, পাঁচ বছর ব্যবহারের খুচরা যন্ত্রাংশ এবং পাঁচ বছর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে চীন সরকার ১ হাজার ৫৯১ কোটি টাকা ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ৪৪ কোটি টাকার মতো ব্যয় করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ব্যয় ছিল মূলত সরকারের শুল্ক ও কর। অর্থাৎ ইঞ্জিনের মূল্য, যন্ত্রাংশ ও রক্ষণাবেক্ষণের পুরো খরচ তারা বহন করত। সামপ্রতিক সময়ে এই প্রকল্প থেকে চীনের পিছিয়ে যাওয়াকে নেতিবাচক সম্পর্ক হিসেবে দেখছেন রেল বিশেষজ্ঞরা।
রেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রেলে বর্তমানে মিটারগেজ ইঞ্জিনের সংকট সবচেয়ে বেশি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটে মিটারগেজ ট্রেন চলাচল করে। এর বাইরে মিটারগেজ ট্রেন চলে উত্তরবঙ্গের বগুড়া, নাটোর, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, পঞ্চগড়সহ আরও কিছু জেলায়। খুলনা ও রাজশাহী অঞ্চলে চলে ব্রডগেজ ট্রেন।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানানো হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ সেকশনে অনেক ইঞ্জিনের আয়ুষ্কাল ইতোমধ্যে পেরিয়ে গেছে। ফলে চীন থেকে অনুদান হিসেবে নতুন ২০টি ইঞ্জিন যুক্ত হলে ট্রেন চলাচলে শিডিউল বিপর্যয় কমে আসত এবং পুরোনো ইঞ্জিনের ওপর চাপ কমায় ট্রেন সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারত, অর্থাৎ রেলের রানিং টাইম বৃদ্ধি পেত।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানান, চীন থেকে অনুদান হিসেবে ২০টি অতিরিক্ত ইঞ্জিন হাতে থাকলে বিভিন্ন রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব হতো। এছাড়া বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহনে গতি আসতো, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলত।
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা শেয়ার বিজকে জানান, এই প্রকল্প নিয়ে চায়না প্রাথমিক সাম্ভব্যতা যাচাই শুরু করেছে বলে আমাদের জানিয়েছে। সরকারের অনুমোদনের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছিল এবং চায়না সরকার তাদের কারখানা ভিজিটের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে আদৌ এই প্রকল্প সামনের দিকে এগিয়ে যাবে বলে মনে করি না।
এই কর্মকর্তা আরও বলেন, কেউ অনুদান দেওয়ার কথা বলে পরে সরেও যেতে পারে নানা কারণে। তবে সব কারণে মনে হচ্ছে এ প্রকল্প ব্যাটে-বলে নাও মিলতে পারে। কারণ পাথমিকভাবে চায়না অনুদান দিতে চাইলে সরকারের তরফ থেকে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে। চীন যে মুহূর্তে অনুদান দিতে চেয়েছিল, ঠিক তার এক বছর পরে একটা পিডিপিপি তৈরি করে পাঠানো হয়েছিল। সুতরাং মনে হয় না, ভালো কোনো ফলাফল পাব আমরা। কিন্তু আমরা চেষ্টা করছি যেন অনুদান হিসেবে ২০টি ইঞ্জিন পেতে পারি।
সড়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, রেলের শুরু থেকেই রোলিং স্টকে সেই কম্বোডিয়া, কানাডা, আমেরিকান, কোরিয়া, ভারত, ইন্দোনেশিয়া এবং সমপ্রতি চীন থেকেও ইঞ্জিন সংগ্রহ করা হয়েছে বা এসেছে, যখন যার কাছ থেকে পেয়েছে স্টক করা হয়েছে। কিন্তু হিউম্যান ডেভলপমেন্ট যদি না হয়, ইনভেন্ট্রি মেইনট্যান্স না করা হয় জিনিসগুলো দীর্ঘস্থায়ী মেয়াদি ব্যবহার করা যায় না। যদিও বলা হয়ে থাকে জাপানি জিনিস ভালো কিন্তু সেই জাপান এখন চীন থেকে প্রযুক্তি নিয়ে রেলের উন্নয়ন করছে।
তিনি আরও বলেন, অন্যান্য দেশ নিজে রোলিং স্টক বানায় না। তারা আস্তে আস্তে দূরদর্শী হয়। কোনো এক একটা দেশের সঙ্গে লং টার্ম স্ট্রাটেজি পার্টনারে যাব এই পরিকল্পনা করে। এই অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে নিজস্বতা বলে কিছু থাকে না। আর এগুলো যেহেতু এক একটা নতুন প্রযুক্তি সেজন্য ভবিষ্যতে কোনো ত্রুটি দেখা দিলে মেরামত করা যেমন কঠিন হয়ে পড়ে। যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতেও অর্থ ব্যয়ের বিষয় থাকে।
অধ্যাপক শামসুল হক আরও বলেন, যাদের সঙ্গে ভালো সাপ্লাই চেইন আছে, যারা গুড পার্টনার এমন একটা বা দুটো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন করা উচিত। এই সময়ে এসে চীন উপযুক্ত। কারণ বিগত দিনেও চীনসহ প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও সহযোগিতা পাওয়া গেছে। এই মুহূর্তে চীন প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। চীন বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রেল ছাড়াও তারা নানা খাতে বাংলাদেশকে বিগত দিনেও সহযোগিতা করেছে।
তিনি আরও বলেন, চীনের এই ২০টি মিটারগেজ অনুদান বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য আশীর্বাদ ছিল। ভারত-জাপান এতোটা দিতে পারেনি চীন যতটা দিয়েছে বা দিতে পারে। বরং যা দিয়েছে তার বেশি নিয়ে গেছে ঋণ দেয়ার শর্তে। যেহেতু রেল নিজে একটা দেউলিয়া প্রতিষ্ঠান হয়ে গেছে। যে রকম অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছে তার সার্ভিস দেওয়ার জন্য তার রোলিং স্টক আনেনি, কোম্পার্টমেন্ট আনেনি, উন্নয়ন করেনি। কিন্তু কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেও বলে লেভেল ক্রসিং এর কারণে ঘটেছে। নতুন নতুন লোকোমেটিভ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, রেল সেবা দিতে পারছে না।
রেল বিশেষজ্ঞরা বলেন, বর্তমান সরকারকে অবশ্যই দূরদর্শী হতে হবে। চীন থেকে যত জিনিস আসবে এতে করে রেলের লং রান কস্ট ইফেকটিভ কমে আসবে। নতুন প্রযুক্তি সুতরাং এটাকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান করা এবং এজন্য এসব ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সরকারের উচিত হবে দ্রুতই চীন সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা।
এদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয়য়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেয়ার বিজকে জানান, চীন আমাদের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী। তাদের দেওয়া এই ২০টি ইঞ্জিন আমাদের রেলওয়ের রোলিং স্টকের সংকট দূর করতে বড় ভূমিকা রাখত। ইঞ্জিনগুলো রেলের বহরে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা বিগত দিনে কাজ করেছি, এখনো চেষ্টা করছি।