26/05/2026
বছরের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন ‘আরাফা দিবস’ আমাদের দোরগোড়ায়। এই বিশেষ দিনটির আমল ও নিয়মাবলী নিয়ে আমাদের মনে প্রায়ই কিছু সাধারণ প্রশ্ন উঁকি দেয়। উম্মাহর সুবিধার্থে এমন ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও হাদীসসম্মত উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
১. প্রশ্ন: আরাফা দিবসের রোজা রাখার ফযীলত কী?
উত্তর: এই দিনের একটি রোজা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহের কাফফারা বা ক্ষমা হিসেবে গণ্য হয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।" (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)
২. প্রশ্ন: এই রোজা কি ছোট-বড় সব গুনাহ মাফ করে দেয়?
উত্তর: ওলামায়ে কেরামদের মতে, আরাফার দিনের রোজার মাধ্যমে মূলত সগীরা (ছোট) গুনাহগুলো ক্ষমা হয়। কবীরা (বড়) গুনাহ মাফের জন্য আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে আলাদাভাবে 'তওবা' করতে হয় এবং মানুষের অধিকার বা হকের সাথে জড়িত কোনো গুনাহ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে ক্ষমা করিয়ে নিতে হয়।
৩. প্রশ্ন: বাংলাদেশ থেকে আমরা কোন দিন রোজা রাখব?
উত্তর: এই বিষয়টি নিয়ে দুটি গ্রহণযোগ্য মতামত রয়েছে। প্রথমত, অনেক ওলামাদের মতে, আরাফা একটি নির্দিষ্ট স্থানের নাম (আরাফার ময়দান) এবং হাজীরা যেদিন সেখানে সমবেত হন, সেটাই আরাফার দিন। তাই বৈশ্বিকভাবে সৌদির তারিখের সাথে মিলিয়ে রোজা রাখা উত্তম। দ্বিতীয়ত, অনেক ওলামার মতে, নিজ নিজ দেশের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে জিলহজ মাসের ৯ তারিখে রোজা রাখা নিয়ম। এই দুই মতের বরকত পেতে এবং ঝুঁকি এড়াতে সচেতন মুসলিমরা ২৬ এবং ২৭ মে—পরপর দুই দিনই রোজা রাখছেন।
৪. প্রশ্ন: যারা হজ্বে গিয়েছেন (হাজীগণ), তারা কি আরাফার দিন রোজা রাখবেন?
উত্তর: না, যারা স্বশরীরে হজ্বে আছেন এবং আরাফার ময়দানে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এই রোজা রাখা সুন্নাহসম্মত নয়। নবীজি (সাঃ) আরাফার ময়দানে রোজা রাখেননি, যাতে হাজীরা ক্লান্ত না হয়ে পূর্ণ শক্তি দিয়ে ইবাদত ও দোয়া করতে পারেন। এই রোজাটি মূলত অ-হাজীদের জন্য।
৫. প্রশ্ন: আরাফা দিবসের সেরা আমল বা জিকির কোনটি?
উত্তর: এই দিনের অন্যতম সেরা আমল হলো বেশি বেশি ইস্তিগফার করা এবং একটি বিশেষ দোয়া পড়া। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ আরাফার দিনে যে সর্বোত্তম বাক্যটি বলেছি, তা হলো—
'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর'।" (সুনানে তিরমিযী)
৬. প্রশ্ন: তাকবীরে তাশরীক কখন থেকে শুরু এবং শেষ হয়?
উত্তর: ৯ই জিলহজ ফজর নামায থেকে শুরু করে ১৩ই জিলহজ আসর নামায পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রতিটি ফরয নামাযের সালাম ফেরানোর পর পুরুষদের জন্য উচ্চস্বরে এবং নারীদের জন্য মনে মনে একবার তাকবীরে তাশরীক পড়া ওয়াজিব।
তাকবীর: "আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।"
৭. প্রশ্ন: আরাফার দিনে দোয়া কবুলের বিশেষ সময় কোনটি?
উত্তর: আরাফা দিবসের পুরোটা সময়ই দোয়ার জন্য বরকতময়। তবে বিশেষ করে দুপুরের পর (যোহর) থেকে শুরু করে সূর্যাস্ত (মাগরিব) পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বান্দার দোয়া কবুল করেন।
৮. প্রশ্ন: পিরিয়ড বা ঋতুস্রাবের কারণে নারীরা রোজা ও নামাজ না পারলে কীভাবে আমল করবেন?
উত্তর: বোনেরা নামাজ ও রোজা না রাখতে পারলেও এই দিনের মূল বরকত থেকে বঞ্চিত হবেন না। তারা দিনভর মুখে মুখে তওবা-ইস্তিগফার করতে পারেন, তাকবীরে তাশরীক বলতে পারেন, তাসবীহ-তাহলীল পাঠ এবং বেশি বেশি দরুদ শরীফ পড়তে পারেন। এছাড়া সাধ্যমতো দান-সদকা করেও সওয়াব অর্জন করা সম্ভব।
৯. প্রশ্ন: আরাফার দিন কি নফল নামাজ পড়ার বিশেষ কোনো নিয়ম আছে?
উত্তর: আরাফার দিনের জন্য নির্দিষ্ট করে আলাদা কোনো কাঠামোর নফল নামাজ (যেমন এত রাকাত বা এই সূরা দিয়ে) হাদীসে বর্ণিত হয়নি। তবে সাধারণ নফল নামাজ, চাশতের নামাজ বা তাহাজ্জুদ বেশি বেশি পড়া অত্যন্ত উত্তম। নামাযের সেজদায় গিয়ে নিজের ভাষায় আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা অত্যন্ত ফলদায়ক।
১০. প্রশ্ন: আরাফার দিন আল্লাহ কত মানুষকে ক্ষমা করেন?
উত্তর: এটি বছরের সবচেয়ে বড় ক্ষমার দিন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "আরাফার দিনের চেয়ে অন্য কোনো দিন আল্লাহ তাআলা এত বেশি বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন না। তিনি বান্দাদের খুব কাছাকাছি হন এবং ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করে বলেন, দেখ আমার বান্দারা কী চায়!" (সহীহ মুসলিম: ১৩৪৮)
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই মহিমান্বিত দিনটির গুরুত্ব বোঝার এবং বেশি বেশি আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
📥 পোস্টটি আপনার ওয়ালে শেয়ার করে রাখুন এবং অন্য ভাই-বোনদের জানার সুযোগ করে দিন।