06/08/2026
সাহস যখন বিক্রির নামে,,, তখন বিলটা কার???
১৯৫৭ সালের ৯ জুন সন্ধ্যার মুখে ব্রড পিকের চূড়ায় চারজন অস্ট্রিয়ান পৌঁছেছিলেন। মার্কুস শ্মুক, ফ্রিৎস ভিন্টারস্টেলার, কুর্ট ডিমবার্গার, হেরমান বুল।
তাদের সঙ্গে বাড়তি অক্সিজেন ছিল না। উঁচু ক্যাম্পে বোঝা টানার পোর্টারও ছিল না।
চারজন নিজেদের মালামাল নিজেরাই বয়েছেন, ক্যাম্প বসিয়েছেন, একবার ঝড়ে নেমে এসে আবার উঠেছেন।
ওই যুগে আট হাজার মিটারের পাহাড়ে ওঠা মানে ছিল সেনা-অভিযান। শত শত পোর্টার, স্তরে স্তরে ক্যাম্প, মাথায় একজন অধিনায়ক যিনি ঠিক করে দিতেন শেষ ধাপে কে যাবে।
ব্রড পিক দেখাল, চারজনেও কাজটা হয়।
আঠারো দিন পর হেরমান বুল মারা গেলেন পাশের পাহাড় চোগোলিসায়।
কুয়াশার ভেতরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি তুষারের একটা কার্নিশে পা দিয়েছিলেন। কার্নিশ মানে ঢালের কিনারা ছাড়িয়ে শূন্যের উপর ঝুলে থাকা জমাট তুষারের ছাদ।
ছাদটা ভাঙল, এবং বুলকে নিয়ে নামল।
বুল তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত পর্বতারোহীদের একজন। চার বছর আগে নাঙ্গা পর্বতে তিনিই প্রথম উঠেছিলেন, এবং উঠেছিলেন একা।
দল ফিরে গিয়েছিল, তিনি যাননি। একটানা চল্লিশ ঘণ্টা হেঁটেছিলেন।
সেই মানুষটাকে নিয়ে গেল এক পশলা কুয়াশা আর এক পা ভুল।
ডিমবার্গার ছিলেন দলের সবচেয়ে কমবয়সী, বুলের শেষ অভিযানের সঙ্গী। তিনি বেঁচে ফিরলেন, এবং পরে হয়ে উঠলেন এই জগতের ইতিহাস-লিখিয়ে।
ঝড়ে আটকা পড়ে মারা গেলেন তার আরোহণ-সঙ্গী জুলি টুলিস। ডিমবার্গার নামলেন কয়েকটা আঙুল বরফে খুইয়ে, এবং নেমে লিখতে বসলেন।
পাহাড়ের সাহিত্যটা এইভাবেই তৈরি হয়েছে। যারা ফেরেন, তারা লেখেন।
উনসত্তর বছর পর, গত ৩০ জুলাই সকালে, ওই একই ব্রড পিকে দশজন মানুষ উপরে উঠছিলেন।
দ্বিতীয় আর তৃতীয় ক্যাম্পের মাঝামাঝি পশ্চিমমুখী গালিটা ভাঙল। ধসের স্রোত দলটাকে প্রায় এক উল্লম্ব মাইল নিচে নামিয়ে দিল।
দশজনই মারা গেছেন।
পরদিন সারা পৃথিবীর কাগজে ছাপা হলো একটা নাম, নির্মল পুরজা।
বাকি নয়জন আসলেন পরে, ছোট হরফে। পুর বাহাদুর গুরুং, নিমা শেরপা, কিলি পেম্বা শেরপা, নাওয়াং থিন্দু শেরপা, গ্যালু শেরপা, সোহেল সাখি।
আর টাকা দিয়ে আসা তিন আরোহী, নাধিরা আল হারথি, ম্যালোরি গাইস, ওয়াং ঝং।
➖
নির্মল পুরজার জন্ম মিয়াগদি জেলার দানা গ্রামে, ধৌলাগিরির ছায়ায়।
ছায়াতেই, পাহাড় তার ঠিকমতো দেখাই হয় নাই। পরিবার নেমে গিয়েছিল চিতওয়ানের সমতলে। গরম, ধুলা, আর ভবিষ্যতের একটাই চেনা রাস্তা।
রাস্তার নাম গোর্খা।
বাবা গোর্খা সৈনিক, তিন বড় ভাই গোর্খা সৈনিক। নেপালের পাহাড়ি জনপদে এটা পেশার চেয়ে বেশি কিছু, একটা প্রজন্ম-চুক্তির মতো।
ছেলে ছোট থেকে দৌড়াবে, পিঠে পাথরের ঝুড়ি নিয়ে পাহাড়ে উঠবে, তারপর ব্রিটিশ বাছাই-শিবিরে গিয়ে হাজার হাজার তরুণের সঙ্গে লড়বে গুটিকয় জায়গার জন্য।
পুরজা টিকলেন, ২০০৩ সালে গোর্খা হলেন।
ছয় বছর পর প্রথম গোর্খা হিসেবে ঢুকলেন রয়্যাল নেভির স্পেশাল বোট সার্ভিসে, ব্রিটেনের সবচেয়ে গোপন বাহিনীগুলির একটায়।
ওই বাছাইয়ে শরীরের চেয়ে বেশি পরীক্ষা হয় মনের। ক্লান্তির শেষ প্রান্তে গিয়ে মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে, আর কে তখনো ভুল করে না, সেটাই দেখা হয়।
ষোল বছরের সামরিক জীবন, আফগানিস্তান, এমবিই, সামনে নিশ্চিত পেনশন।
কিন্তু তিনি চাকরি ছাড়লেন, বাড়ি বন্ধক রাখলেন, এবং ২০১৯ সালের বসন্তে ঘোষণা দিলেন, চোদ্দটা আট হাজার মিটারের পাহাড় তিনি সাত মাসে শেষ করবেন।
কাজটা তখন পর্যন্ত সবচেয়ে দ্রুত যিনি করেছেন, তার লেগেছিল প্রায় আট বছর।
পর্বতারোহণের প্রতিষ্ঠিত মহল ঘোষণাটা গুরুত্বই দিল না।
➖
চোদ্দটা আট হাজারি পাহাড়েই প্রথম উঠেছিলেন রাইনহোল্ড মেসনার। লেগেছিল ষোল বছর।
কিন্তু তার কাছে কয়টা উঠলেন সেটা কখনো বড় কথা ছিল না, কীভাবে উঠলেন সেটাই ছিল আসল কথা।
১৯৭৮ সালে তিনি আর পেটার হাবেলার এভারেস্টে উঠলেন অক্সিজেনের বোতল ছাড়া।
আট হাজার মিটারের উপরে বাতাসে অক্সিজেন সমতলের তিন ভাগের এক ভাগ। আরোহীরা ওই এলাকার নাম দিয়েছেন ডেথ জোন।
নামটা কোনো রূপক না। ওই উচ্চতায় শরীর আর নিজেকে সারিয়ে তুলতে পারে না, শুধু ক্ষয় হতে থাকে।
ডাক্তাররা তখন বলছিলেন, বোতল ছাড়া ওখানে গেলে মানুষের মাথা আর কাজ করবে না।
নেমে এসে মেসনার লিখলেন, চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেকে আর মানুষ মনে হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল তিনি কেবল একটা হাঁপাতে থাকা ফুসফুস।
এই ঘরানার লোকেরা মনে করেন, পাহাড় জেতার জিনিস না, পাহাড় হলো আয়না। সঙ্গে দড়ি-অক্সিজেন-লোকবল যত কম, নিজের সম্পর্কে জানাটা তত সৎ।
সহজ করে বললে, সরঞ্জাম যত বাড়ে, কীর্তিটা তত পাহাড়ের সঙ্গে মানুষের না, পাহাড়ের সঙ্গে প্রযুক্তির।
পোল্যান্ডের আরোহীরা এই যুক্তিটাকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিলেন, খানিকটা বাধ্য হয়েই।
তারা যখন হিমালয়ে পৌঁছালেন, চোদ্দটা চূড়াই অন্যদের নামে লেখা হয়ে গেছে। প্রথমবার ওঠার গৌরব আর কিছুই বাকি নাই। বাকি ছিল শুধু শীতকাল।
তারা শীতকালটাই বেছে নিলেন। মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রিতে, প্রচণ্ড বাতাসে, একের পর এক পাহাড়ের প্রথম শীতকালীন আরোহণ হতে থাকল পোলিশদের হাতে।
তাদেরই একজন, ভয়তেক কুর্তিকা, ব্যাপারটার নাম দিয়েছিলেন কষ্ট সহ্য করার শিল্প।
এদের সবার পূর্বপুরুষ জর্জ ম্যালোরি। ১৯২৩ সালে এক মার্কিন সাংবাদিক তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এভারেস্টে কেন যেতে চান।
ম্যালোরি উত্তর দিয়েছিলেন তিন শব্দে। পাহাড়টা ওখানে আছে।
পরের বছর তিনি এভারেস্টেই থেকে গেলেন, আর তার ওই তিন শব্দ হয়ে গেল গোটা খেলাটার ধর্মগ্রন্থ।
মানে নিয়ে একশো বছর তর্ক চলেছে, কিন্তু ভেতরের কথাটা সবাই বুঝেছেন। যে কাজের কোনো লাভ নাই, মানুষ সেই কাজটাই বেছে নেয় নিজেকে মাপার জন্য।
তারপর আসলো ১৯৯৬ সালের মে মাস।
এভারেস্টে এক রাতের ঝড়ে মারা গেলেন আটজন। তাদের দুজন ছিলেন বাণিজ্যিক অভিযানের প্রধান গাইড, অর্থাৎ যারা টাকা নিয়ে ক্লায়েন্টদের উপরে তুলছিলেন।
ওই রাতে বেঁচে ফেরা এক সাংবাদিক, জন ক্রাকাওয়ার, লিখলেন "ইনটু থিন এয়ার"। বইটা এই সাহিত্যের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া বই, এবং সবচেয়ে ঝগড়া বাধানো বই।
বইয়ের প্রশ্নটা সরল। দড়ি যদি আগে থেকে বাঁধা থাকে, অক্সিজেন যদি বোতলে আসে, গাইড যদি বেতন পান, তাহলে চূড়ায় ওঠাটা কার কীর্তি?
আর ঝড় এলে ঝুঁকিটা কার?
ক্রাকাওয়ারের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন আনাতোলি বুকরেয়েভ, কাজাখ গাইড, যিনি সেই রাতে একাই তিনজনকে ঝড়ের ভেতর থেকে টেনে বের করে এনেছিলেন।
তার জবাব ছিল এক বাক্যের। পাহাড় তার কাছে উচ্চাশা মেটানোর মাঠ না, পাহাড় তার কাছে উপাসনার জায়গা।
পরের বছরই বুকরেয়েভ মারা যান, অন্নপূর্ণায়, ধসে।
এই হলো সেই জগৎ, যেটা ২০১৯ সালে পুরজার ঘোষণাকে গুরুত্ব দেয় নাই।
তাদের দরজায় দাঁড়িয়ে এক অচেনা প্রাক্তন কমান্ডো বলছেন, চোদ্দটা চূড়া তিনি সাত মাসে করবেন।
বোতলের অক্সিজেন নিয়ে, আগে থেকে বাঁধা দড়ি ধরে, দল সঙ্গে নিয়ে, বুকে স্পনসরের লোগো লাগিয়ে।
জগৎটার হিসাবে এটা আরোহণ না, এটা বিজ্ঞাপন।
কিন্তু ওই জগৎ নিজের সম্পর্কে একটা কথা কখনো বলেনি। দেড়শো বছর ধরে এই সাহিত্যের নায়করা প্রায় সবাই সাদা চামড়ার, আর নেপালিরা পাদটীকা।
১৯৫৩ সালে এভারেস্টে হিলারি আর তেনজিং নোরগে একসঙ্গে উঠেছিলেন, একই দড়িতে বাঁধা।
ফিরে আসার পর হিলারি নাইট উপাধি পেলেন, তেনজিং পেলেন তার চেয়ে নিচু মানের একটা পদক।
সেই ব্যাকরণটা বদলায়নি। নেপালিরা বোঝা বয়েছেন, দড়ি বেঁধেছেন, রাস্তা খুলেছেন, মরেছেন, আর সাহেবের বইয়ের শেষে কৃতজ্ঞতার জায়গায় দুই লাইন পেয়েছেন।
ম্যালোরির প্রশ্নের উত্তরে পুরজার কথাটাও প্রায় তিন শব্দের। দেখাতে চাই, নেপালিরা কী পারে।
➖
এপ্রিল থেকে মে, ২০১৯। অন্নপূর্ণা, ধৌলাগিরি, কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট, লোৎসে, মাকালু।
ছয়টা আট হাজারি এক বসন্তে। মাঝপথে অন্নপূর্ণায় নিজে চূড়ায় ওঠার পরদিন আবার উপরে গেলেন, এক নিখোঁজ আরোহীকে খুঁজতে।
জুন-জুলাই, পাকিস্তান। নাঙ্গা পর্বত, দুই গাশারব্রুম, কে-টু, ব্রড পিক।
যে গ্রীষ্মে কে-টুতে দল-কে-দল আবহাওয়ায় হার মেনে ফিরছিল, তার দল উপরে উঠে দড়ি বেঁধে রাস্তা খুলে দিল, পেছনে বাকিরা উঠল।
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, চো ইয়ু, মানাসলু, শিশাপাংমা।
চোদ্দটা চূড়া, একশো উননব্বই দিন। আগের দ্রুততম রেকর্ড ছিল কোরিয়ার কিম চাং-হোর, প্রায় আট বছরের।
বিশুদ্ধতাবাদীরা রেকর্ডটার পাশে তারকাচিহ্ন বসালেন। অর্থাৎ, রেকর্ড হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শর্ত দিয়ে। অক্সিজেন ছিল, বাঁধা দড়ি ছিল, দল ছিল।
বসাতেই পারেন, ঘরানার সেই অধিকার আছে।
কিন্তু এড ভিস্টার্স, যিনি নিজে চোদ্দটাতেই উঠেছেন অক্সিজেন ছাড়া, তিনিও স্বীকার করেছেন একটা কথা।
ওই সময়ের ভেতর বারবার ডেথ জোনে ঢুকে বেরিয়ে আসা একটা শরীর কী করে সইল, শারীরবৃত্তবিদ্যার কাছে তার পুরো জবাব নাই।।
আরোহীদের নিজেদের কথায়, ডেথ জোনে ঢোকার পর প্রশ্নটা আর মরা-বাঁচার থাকে না প্রশ্নটা থাকে, কত ধীরে মরছেন।
তারপর আসলো সেই জানুয়ারি, যেটা তারকাচিহ্নগুলো মুছে দিল।
শীতের কে-টু ছিল এই খেলার শেষ বাকি থাকা কাজ।
পোলিশরা তেরোটা আট হাজারি পাহাড়ের প্রথম শীতকালীন আরোহণ ঘরে তুলেছিলেন, কিন্তু কে-টু তাদেরও বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে।
মাইনাস ষাট ডিগ্রি, ঘণ্টায় দুইশো কিলোমিটার বাতাস, আর পাহাড়টার নিজের মেজাজ। কে-টু এমনিতেই এভারেস্টের চেয়ে অনেক বেশি ভয়ংকর।
শীতে সেটা অসম্ভব বলেই ধরে নেওয়া হতো।
২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি বিকেলে দশজন মানুষ চূড়ার দশ মিটার নিচে এসে থামলেন।
থামলেন, কারণ ঠিক করা ছিল কেউ একা আগে উঠবেন না।
দশজনই নেপালি, এসেছিলেন তিনটা আলাদা প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে। শেষ দশ মিটার তারা একসঙ্গে হাঁটলেন, আর হাঁটতে হাঁটতে গাইলেন জাতীয় সংগীত।
দেড়শো বছরের পাদটীকা ওই দশ মিটারেই শিরোনামে উঠে এল।
দশজনের একজন পুরজা। তার দাবি, তিনি উঠেছিলেন অক্সিজেন ছাড়া।
২০১৯ সালের মে মাসে এভারেস্টের চূড়ার নিচে সরু রিজে শত শত মানুষের লাইনের ছবিটা তিনিই তুলেছিলেন।
ছবিটা পৃথিবীজুড়ে ছাপা হয়েছিল একটা কথা বোঝাতে, টাকা দিয়ে যত মানুষ উঠছে, পাহাড়ের ধারণক্ষমতা তত নাই।
এর পরের বছরগুলোতে ভিড়টা কমেনি, বেড়েছে। আর সেই ভিড় থেকে যারা সবচেয়ে বেশি আয় করেছে, পুরজার কোম্পানি তাদের একটা।
কে-টুর জাতীয় সংগীত আর এভারেস্টের ওই লাইন, দুইটাই তার হাতের কাজ।
প্রথমটায় নেপালিরা প্রথমবার সাহেবের জায়গায় বসল। দ্বিতীয়টা প্রশ্ন তোলে, বসার পর তারা ব্যবসাটা চালাল কীভাবে।
উত্তরটা টাকার হিসাবে।
➖
নেটফ্লিক্সে "ফোরটিন পিকস" মুক্তির পর বাণিজ্যিক আরোহণের চেহারা বদলে গেল।
পুরোনো নিয়ম ছিল এক মৌসুমে এক চূড়া। শরীরকে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সময় দেওয়া, আবহাওয়ার জন্য বসে থাকা, দরকার হলে ফিরে আসা।
নতুন নিয়মে ক্লায়েন্ট চূড়া জমান। এক মৌসুমে দুইটা, তিনটা। কম অপেক্ষা, বেশি অক্সিজেন, মাথাপিছু গাইড।
কারণ যে জিনিসটা বিক্রি হচ্ছে সেটা আর অভিজ্ঞতা না, সেটা রেকর্ড। আর রেকর্ডের ব্যবসায় সবচেয়ে দামি জিনিস সময়।
পাহাড়ে সময় বাঁচানোর একটাই উপায়। আবহাওয়ার জানালাটা যতক্ষণ খোলা, তার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত ব্যবহার করা।
ব্রড পিক এই খেলা আগেও দেখেছে।
পাহাড়টার চূড়ার রিজ দেড় কিলোমিটার লম্বা, আর আসল চূড়ার আগে পড়ে একটা ভুয়া চূড়া, যেটা নিচ থেকে আসলটার মতোই দেখায়।
১৯৮৮ সালের মার্চে পোলিশ আরোহী মাচিয়েই বেরবেকা শীতের ঝড়ের ভেতর একা উঠে ওই ভুয়া চূড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন।
নেমে আসার পর জানলেন, আসল চূড়া তার সতেরো মিটার উপরে ছিল।
পঁচিশ বছর পর, আটান্ন বছর বয়সে, তিনি ফিরে আসলেন। এবার আসল চূড়ায় উঠলেন। নামার পথে তিনি আর তার তরুণ সঙ্গী তোমাশ কোভালস্কি থেকে গেলেন।
বেরবেকা জানতেন তিনি কী ঝুঁকি নিচ্ছেন, এবং ঝুঁকিটা তার নিজের বেছে নেওয়া।
প্যাকেজ-অভিযানে হিসাবটা অন্য। ছেচল্লিশ দিনের সূচি, ফেরার টিকিট, পরের অভিযানের বুকিং।
অভিযান বাতিল মানে ক্লায়েন্টের টাকা ফেরত, খালি হাতে ফেরা দল, আর পরের মৌসুমের বুকিংয়ে ধাক্কা।
ব্রড পিকে গ্রীষ্মের জানালা ধরা হয় পনেরো থেকে ত্রিশ জুলাই। শেষ সপ্তাহে আবহাওয়া ভাঙতে শুরু করেছিল, ভারী তুষারপাত, ঢালে জমা অস্থির স্তর।
দলগুলো একে একে নেমে গেল।
পুরজার দল থাকল। ৩০ জুলাই সকালে, শেষ দিনে, তারা উপরে উঠছিল।
সেদিন সিদ্ধান্তটা ঠিক কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, তা আর জানা যাবে না। যিনি নিয়েছিলেন, তিনি নিজেও সেখানে ছিলেন।
কিন্তু সিদ্ধান্তটা যে পরিস্থিতিতে নিতে হয়েছিল, সেটা জানা যায়। একটা ব্যবসা যখন গতি বিক্রি করে, তখন অপেক্ষা করাটাই তার সবচেয়ে বড় খরচ।
আর যে গুণটা পুরজাকে তৈরি করেছিল, সেটাও এখানে কাজ করেছে। এসবিএসের বাছাইয়ে দেখা হতো, চরম ক্লান্তিতেও কে ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
যেখানে সবাই ফিরে যায়, সেখানে না ফেরাটাই ছিল তার পরিচয়, তার বইয়ের ভাষায়, হাল ছেড়ে দেওয়া তার রক্তে নাই।
এই বাজিটা তিনি বহুবার ধরেছেন এবং প্রতিবার জিতেছেন।
এড ভিস্টার্স বলেছিলেন, চূড়ায় ওঠা ঐচ্ছিক, নেমে আসা বাধ্যতামূলক।
কথাটার নিষ্ঠুর দিক হলো, ভুল করার সুযোগ একবারই।
একজন মানুষের গল্প হিসেবে এটা পরিচিত ছাঁচ। যে গুণ মানুষটাকে বড় করে, সেই গুণই তাকে শেষ করে। বুল, বেরবেকা, বুকরেয়েভ, সবার বেলায় একই কথা লেখা যায়।
কিন্তু ওই তিনজন যখন বাজি ধরেছেন, বাজিটা ছিল তাদের নিজের।
৩০ জুলাই সকালে ঢালে পুরজা একা ছিলেন না। তার সঙ্গে ছিলেন ছয়জন, যারা ওই বাজিতে বসেছিলেন বেতনের বিনিময়ে।
➖
টাকাটা কোথা থেকে আসে, সেই হিসাবটাও এখানে আসে।
নেপালে এভারেস্টে ওঠার সরকারি ফি এখন জনপ্রতি পনেরো হাজার ডলার।
এই বসন্তে নেপাল রেকর্ড চারশো বিরানব্বইটা পারমিট দিয়েছে, আয় হয়েছে প্রায় বাহাত্তর লাখ ডলার। ত্রিশটা পাহাড় মিলিয়ে মোট তিরাশি লাখ।
কিন্তু ক্লায়েন্ট সরকারকে যা দেন, কোম্পানিকে দেন তার অনেক গুণ বেশি। এ বছর নেপালের দিক দিয়ে এভারেস্ট প্যাকেজের গড় দাম একষট্টি হাজার ডলারের কাছাকাছি।
পুরজার কোম্পানি এলিট এক্সপেডের এভারেস্ট প্যাকেজ শুরু হয় পঁয়তাল্লিশ হাজার থেকে। ব্রড পিকের পূর্ণ-সেবা প্যাকেজ পঁচিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ হাজার।
এবার দেখুন টাকাটা কোথায় যায়।
যে পাকিস্তানি পোর্টার ওই একই ঢালে ওঠেন, তার সমস্ত মৌসুমের পারিশ্রমিক আনুমানিক পাঁচ হাজার ডলার।
আর তিনি ঢাল পার হন ক্লায়েন্টের চেয়ে অনেক বেশিবার। ক্লায়েন্ট চূড়ায় ওঠেন একবার।
উপরের ক্যাম্পগুলোতে তাঁবু, খাবার, অক্সিজেনের বোতল পৌঁছাতে পোর্টারকে একই বিপজ্জনক রাস্তা মৌসুমে বারবার পার হতে হয়।
অর্থাৎ যিনি সবচেয়ে কম পান, তিনিই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি নেন। ক্লায়েন্টের এক ছুটির দামে পোর্টারের ছয় বছর।
মৃত্যুর দামটাও সরকারি খাতায় লেখা আছে। নেপাল গত বছর গাইডদের বাধ্যতামূলক বিমা বাড়িয়ে করেছে বিশ লাখ রুপি, ডলারে হাজার চৌদ্দ।
বাড়িয়েছে, এবং প্রশংসাও প্রাপ্য। তবু অঙ্ক দুইটা পাশাপাশি রাখলে হিসাবটা পরিষ্কার হয়।
একজন গাইড মারা গেলে তার পরিবার যা পায়, সেটা তার ক্লায়েন্টের এক অভিযানের খরচের এক-তৃতীয়াংশ।
পাকিস্তানের দিকে এই কেন্দ্রীয় নিয়মটাই নাই। কে কত বিমা পাবেন, সেটা নির্ভর করে কোন কোম্পানির হয়ে কাজ করছেন তার উপর।
উদ্ধারের ব্যবস্থাও তাই।
৩০ জুলাই দুর্ঘটনা ঘটেছিল দিনের প্রথম ভাগে। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ খবর পেল রাত দশটায়। বেসক্যাম্প থেকে জানানোর কথা ছিল, জানানো হয়নি।
অনুসন্ধান শুরু হলো পরদিন সকালে।
নেপালে বেসরকারি হেলিকপ্টার আধঘণ্টার মধ্যে উড়তে পারে। গিলগিট-বালতিস্তানে সেই ব্যবস্থাও নাই। উদ্ধার মানে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার আর স্তরে স্তরে ছাড়পত্র।
মোদ্দা কথাটা এই, ক্লায়েন্ট টাকা দেন বেসরকারি কোম্পানিকে, মুনাফাও যায় সেখানেই।
কিন্তু কিছু ঘটে গেলে উদ্ধার করতে আসে রাষ্ট্র, নয়তো কেউ আসে না।
➖
এই অসমতাটা পাহাড়ের ব্যবসার চেয়ে পুরোনো।
১৮১৪-১৫ সালের যুদ্ধে নেপাল হারল। জিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম যে কাজটা করল, তা হলো পরাজিত সৈনিকদের নিজের বাহিনীতে ভর্তি করা।
কারণ তাদের কর্মকর্তারা কাগজে খোলাখুলিই লিখেছিলেন। এই পাহাড়িরা অসাধারণ যোদ্ধা, এবং সস্তা।
সাহস রপ্তানির ব্যবসা সেখান থেকেই শুরু। দুই বিশ্বযুদ্ধে অন্যের পতাকার নিচে মারা যান তেতাল্লিশ হাজারের বেশি গোর্খা।
১৯৪৭ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে লেখা হলো, ব্রিটিশ বাহিনীর নেপালি সৈনিক তার ব্রিটিশ সহকর্মীর সমান মর্যাদা পাবেন।
লেখা হলো, মানা হলো না। পেনশন বাঁধা হলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর হারে, অর্থাৎ লন্ডনে থাকা মানুষটাকে দেওয়া হলো কাঠমান্ডুর দরে।
১৯৮৯ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নথিতে ধরা পড়ল, একই পদের ব্রিটিশ আর গোর্খা ক্যাপ্টেনের পেনশনের ফারাক সাড়ে নয়শো শতাংশ ছাড়িয়েছে।
এরপর ত্রিশ বছরের মামলা, লন্ডনের ফুটপাতে বৃদ্ধ সৈনিকদের অনশন। আজও প্রায় আট হাজার প্রাক্তন গোর্খা সমান পেনশন পান না।
এই ফেব্রুয়ারিতে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট সরকারকে ব্রিটেনের সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দিয়েছে। রায়ে আদালত একটা কথা লিখেছে, যেটা এই পুরো লেখার সঙ্গে মেলে।
চুক্তিটা হয়েছিল অসম ক্ষমতার টেবিলে, তাই কাগজে সমতা লেখা থাকলেও বাস্তবে সেটা আসে নাই।
দুইশো বছর ধরে যে দেশ সৈনিক রপ্তানি করেছে, সে এখন গাইড রপ্তানি করে। ক্রেতা বদলেছে, সাম্রাজ্যের জায়গায় এসেছে অভিযান-কোম্পানি।
কিন্তু যেটা বিক্রি হচ্ছে সেটা একই জিনিস, আর তার দাম আজও ঠিক করে দেয় ক্রেতা।
পুরজার পরিবারেই পুরো ইতিহাসটা আছে। বাবা সৈনিক, ভাইরা সৈনিক, আর তিনি সৈনিক থেকে গাইড, গাইড থেকে মালিক।
এইখানেই আসলে তার গল্পের ওজন।
দুইশো বছর ধরে নেপালির দাম ঠিক করেছে অন্যরা। পুরজা সেই টেবিলে গিয়ে বসেছিলেন।
এলিট এক্সপেডের প্রতিষ্ঠাতা নেপালি, শীর্ষ গাইডরা নেপালি, আর মুনাফার বড় ভাগটা সম্ভবত এই ব্যবসার ইতিহাসে প্রথমবার নেপালি হাতে থেকেছে।
শীতের কে-টুতে সেই জাতীয় সংগীত এই অর্জনেরই উৎসব ছিল।
কিন্তু টেবিলে বসা আর টেবিলের নিয়ম বদলানো এক জিনিস না।
মালিক বদলাল, নিচের তলার মজুরি বদলাল না। ব্যবসা বাড়ল, বিমার অঙ্ক সেই অনুপাতে বাড়ল না। যে ভিড়ের ছবি তিনি তুলেছিলেন, সেই ভিড় আরও ঘন হলো।
➖
নির্মল পুরজার বয়স হয়েছিল তেতাল্লিশ। ২৫ জুলাই জন্মদিন গেল, আর পাঁচদিন পর তিনি ব্রড পিকে মারা গেলেন।
১৯৫৭ সালে এই পাহাড়ে চারজন উঠেছিলেন নিজের বোঝা নিজের পিঠে নিয়ে, আর ঝুঁকিটাও নিজের কাঁধে।
বুল যখন চোগোলিসার কুয়াশায় হারিয়ে গেলেন, দেনাটা লেখা হয়েছিল তার নিজের নামে। নিজের ইচ্ছায় ধরা বাজির দেনা।
উনসত্তর বছরে খেলাটা ব্যবসা হয়ে গেছে। এখন বোঝাটাও বেতনভুক পিঠে ওঠে, ঝুঁকিটাও।
ম্যালোরির প্রশ্নের উত্তরে এখন একই দড়িতে তিনরকম মানুষ হাঁটেন। কেউ ওঠেন নিজেকে মাপতে, কেউ ওঠেন ছবি তুলতে, আর সবচেয়ে বড় দলটা ওঠে সংসার চালাতে।
ধস তিন দলকেই সমানভাবে টানে। কাগজ টানে না, বিমাও টানে না।
পুরজার জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইটা ছিল এই না-টানার বিরুদ্ধেই। যাদের নাম বইয়ের শেষপাতায় থাকত, তাদের তিনি প্রথম পাতায় তুলে এনেছিলেন।
একশো উননব্বই দিনে, শীতের কে-টুতে, চূড়ার নিচে গাওয়া ওই জাতীয় সংগীতে।
তার নিজের মৃত্যুর খবরে পুরোনো ব্যাকরণটাই ফিরে আসল। এক শিরোনাম, নয়টা ছোট হরফের নাম।
প্রশ্নটা কখনো ছিল না যে তিনি বড় মাপের মানুষ ছিলেন কি না। ছিলেন। বুল, মেসনার, বেরবেকাদের সঙ্গেই তাকে পড়া হবে।
প্রশ্নটা হলো, সাহস যখন বিক্রির জিনিস, তখন বিলটা কার নামে কাটা হয়।
৩০ জুলাই সকালে বিলটা কাটা হয়েছিল দশজনের নামে।
কিন্তু শিরোনাম হয়েছিল একজনের।
collected
#ব্রডশিট #নেপাল #পাকিস্তান #পর্বতারোহণ #শ্রম