03/08/2026
আমি জানতাম এদেশে নিরাপত্তা নেই। ভাবতাম হয়তো সর্বোচ্চ আমার ফোনটাই ছিনতাই হবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, এই দেশে আসলে একজন মানুষকেও মুহূর্তের মধ্যে গায়েব করে দেওয়া যায়।
গত ৩১ শে জুলাই ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো বাস না পাওয়ায় উত্তরা BNS Center থেকে একটি প্রাইভেট গাড়িতে উঠি । ভাড়া ঠিক করে উঠার পর প্রথম দেখায় সবকিছুই স্বাভাবিক। রাস্তাঘাট, যানজট এসব নিয়েই সাধারণ কথাবার্তা চলছিল। এক মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি, আমি নিজের জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর কয়েক ঘণ্টার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
গাড়ির গাজীপুর বাইপাসের ফ্লাইওভারে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ গাড়ি ঘুরে ঢুকে পড়ল বাইপলাইন রোডে।
আমি বাম দিকের জানালার পাশে বসা ছিলাম। তারপর একজন বলল, " ভাই, আমার বমি আসতেসে। আপনি একটু মাঝখানে বসেন।"
আমি মাঝখানে বসলাম।
এরপরের ঘটনাগুলো ঘটেছে খুবই দ্রুত।
ওরা জানালার গ্লাস তুলে দেয় এবং দুই পাশ থেকে দুজন আমাকে শক্ত করে চেপে ধরে । দুইজনের হাতেই বন্দুক ছিলো আর বন্দুকের নল আমার কোমরের কাছে চেপে ধরে।
সহজাতই আমি নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি । ধস্তাধস্তি করতে করতে গাড়ির একটি জানালার কাচ ভেঙে ফেলি। কিন্তু সংখ্যায় তারা বেশি ছিল। একপর্যায়ে আমার হাত পা বেঁধে ফেলে, চোখে এবং মুখে টেপ লাগিয়ে দেয় এবং নাকের কাছে কিছু একটা ধরে যার কারণে আমি কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়ি।
তারা আমার ফোন কেড়ে নেয়। ছুরি ও বন্দুকের মুখে ফোনের লক খুলতে বাধ্য করে। আমার পরিচয়, আমি কী করি, আমার পরিবার - সব তথ্য ওরা আমার ফোন ঘেটে বের করে ।
এরপর শুরু হয় আরেক দুঃস্বপ্ন।
ওরা জানিয়ে দেয়, টাকা না দিলে আমাকে আর জীবিত ছাড়া হবে না।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমাকে ওই রাস্তায় নিয়ে ঘুরতে থাকে। নির্যাতন চলতে থাকে। এরপর আমার পরিবারের কাছে ফোন করে ৫ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে।
এদিকে আমার পরিবার আমার লোকেশন ট্র্যাক করার চেষ্টা করছিল। তারা টাকা পাঠানোর পর অপহরণকারীরা আমার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন দোকানে টাকা ক্যাশ আউট করেছে। আমার আইফোনটিও নিয়ে গেছে। ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করে এটিএম থেকেও টাকা তুলে নিয়েছে। এসব লেনদেনের সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ চলমান আছে।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা বুঝতে পারে, তাদের অবস্থান ধীরে ধীরে শনাক্ত হয়ে যাচ্ছে।
অবশেষে রাত প্রায় ১১টার দিকে, হাত-পা বেঁধে আমাকে রাজেন্দ্রপুর এলাকায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।এরপর স্থানীয় কিছু মানুষ আমাকে উদ্ধার করে এবং পরিবারের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। তাদের সহায়তায় আমি থানায় গিয়ে পৌছাই।
বর্তমানে আমি চিকিৎসাধীন। আমার পায়ে গুরুতর আঘাত রয়েছে। এখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারি না। ফোন নেই, অনেক মূল্যবান জিনিস নেই। কিন্তু সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে অন্য জায়গায়।
আমি রাস্তার মানুষকে বিশ্বাস করার সাহস হারিয়েছি।
আজ বুঝেছি, একজন সাধারণ মানুষ কত সহজে অপহরণের শিকার হতে পারে। এজন্য হয়তো বাংলাদেশে লিফট কালচার নেই, সাহায্য করার কালচার নেই।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার জীবন, অর্থ, পরিচয় সবকিছু কেড়ে নেওয়া সম্ভব।
এই অভিজ্ঞতার পর আমার একটাই প্রশ্ন আমরা আসলে কতটা নিরাপদ?
যদি একটি ব্যস্ত মহাসড়ক থেকে একজন মানুষকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করা যায়, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঘোরানো যায়, তার ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার টাকা তুলে নেওয়া যায়, তারপর নির্জন স্থানে ফেলে রেখে পালিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আমি বিচার চাওয়ারও সাহস পাই না। এদেশে খুনি ধরা পরার পরও যখন খুনের বিচার হতে দেখি না, সেখানে নিজের জন্য বিচার চাইতে আমার লজ্জা হয়।
তবে আজ আমি ফিরে এসেছি। আল্লাহর রহমতে আমার পায়ে বড় ক্ষতি হলেও এছাড়া কোনো ক্ষতি হয় নি। কিন্তু আগামীকাল যদি অন্য কেউ ফিরে না আসে? সেই দায়ভার কার?
আপনারা যারা আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
দোয়া করবেন আমার জন্য ও দেশের জন্য।
-রিমন