21/02/2021
"পাকিস্তানের মাত্র ৭% মানুষ উর্দুতে কথা বলে।
মানে হচ্ছে প্রতি ১০০ জন পাকিস্তানির মধ্যে ৯৩ জন পাঞ্জাবী, সিন্ধি, বালুচি ইত্যাদি অন্যান্য ভাষায় কথা বলেন -- উর্দু ভাষায় কথা বলেন না।
১৯৫২ সালে বাংলা ভাষাও পাকিস্তানের অংশ ছিল। তাহলে অংকের হিসাবে মাত্র ৩% থেকে ৪% পাকিস্তানি নাগরিক তখন উর্দুতে কথা বলতো।
মাত্র ৩-৪%।
সুতরাং, আপনারা যে গানটা গান "ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়" -- সেই গানের অর্থ হচ্ছে ১৯৫২ সালে শুধু বাংলা ভাষা না, সমগ্র পাকিস্তানের ৯৭% মানুষের মুখের ভাষাই তাহলে কাইরা নিতে চাচ্ছিল পাকিস্তানের সরকার --- উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা বানাতে গিয়ে।
ব্যাপারটা আসলে সেরকম ছিল না।
বহু ভাষার দেশ পাকিস্তানকে ইউনাইটেড করার একটা ধারণা থেকে তখনকার পাকিস্তানি সরকার খুবই কম মানুষের ভাষা উর্দুকে বেছে নিয়েছিল রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে। পাঞ্জাবী, বাংলা, সিন্ধি, বেলুচি ইত্যাদি বড় বড় ভাষাকে বাদ দিয়ে।
এখানে বলে রাখা ভালো রাষ্ট্র ভাষা চালু করা মানে কারও ভাষা কেরে নেওয়াও না। এটা জাস্ট অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ , আইন আদালত, কোর্ট কাচারীর একটা ব্যাপার।
আমি মনে করি উর্দুকে না নিয়ে ভারতের মতো তৎকালীন পাকিস্তান যদি সরাসরি ইংরেজিকে রাষ্ট্র ভাষা বানায় দিতো তাহলে তাদের ঝামেলা অনেক কম হতো।
যাহোক, বাঙালিদের প্রবল প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদাও দেওয়া হয়। ১৯৫২ সালের দু এক বছরের মধ্যেই। অর্থাৎ বাঙালির ভাষার দাবি মেনে নেওয়া হয়।
পাকিস্তানের অফিসারগণ, সচিব গণ , বিচারকগণ রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলা শিখতে শুরু করেন বাধ্যতমূলকভাবে। তখন অনেক পূর্ব পাকিস্তানি বাংগালি বাংলা শিখাতে পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়া আসাও শুরু করেন।
অর্থাৎ অফিসিয়াল ভাবে, অফিসিয়াল ভাষার মর্যাদা পেয়েছিল বাংলা ভাষা ইউনাইটেড পাকিস্তানে।
আজকের ভাষা নিয়ে কান্নাকাটির ভেতরে উপরের এই তথ্যটি চেপে যাওয়া হয়।
হয়তো অনেকে ভয় পান, বেয়ারা কেউ ভাবতে শুরু করে কিনা যে শুধুমাত্র পূর্ব বাংলার অফিসিয়াল ভাষা হবার চাইতে , পূর্ব-পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের অফিসিয়াল ভাষা হতে পারার ব্যাপারটা বাংলার জন্যে অধিক মর্যাদার ছিল।
বাংলা ভাষা নিয়ে আর একটা দাবি আজকাল প্রচুর করা হয়। সেটা হচ্ছে যে ভাষা নিয়ে সারা দুনিয়ায় এক মাত্র বাঙালিরাই জীবন দিয়েছে, রক্ত ঝরিয়েছে।
এই দাবিটাও সত্য না। ভাষার জন্যে রক্ত আরো কিছু জাতি দিয়েছে। একাধিক জাতি। শুধু বাংগালি জাতি না।
তবে এটা ঠিক যে ভাষা নিয়ে মারামারি করার পুরা ব্যাপারটাই একটু রেয়ার। কারণ দুনিয়ার অধিকাংশ কনফ্লিক্ট হয় অর্থনীতি কিংবা টাকা পয়সার ভাগ বাটোয়ারা / শোষণ থেকে।
ভাষার মতো একটা আবেগী ইস্যুতে আসলে শোষক এবং শোষিত উভয়ের সংখ্যাই দুনিয়াতে হয়তো একটু কম।
আর শুধু ভাষা না, এমন আরও অনেক কিছু খুব রেঁয়ার ইস্যু আছে যার জন্যে একমাত্র বাঙালিরাই রক্ত দিয়েছে।
যেমন, বিয়ের দাওয়াতে গরুর মাংস কম পড়ায় ছেলে পক্ষ বনাম মেয়ে পক্ষের মারামারিতে রক্ত / জীবন দেবার ব্যাপারটি।
বাঙালি ভাষা নিয়ে প্রচুর পাকিস্তান বিরোধী চেতনা ঝরানোর পরেও বাঙালি জীবন থেকে উর্দু এবং পাকিস্তানকে সে ততটা সরাতে পারেনি যতটা পাকিস্তানিরা বাঙালিদের ক্ষেত্রে পেরেছে।
অর্থাৎ, বাংলা এবং বাঙালির কোন অস্তিত্ব এখন আর পাকিস্তানে নেই। কিন্তু উর্দু এবং পাকিস্তান বাঙালি জীবনে জড়িয়ে আছে।
যেমন, বাঙালি নারী জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে টিকে আছে পাকিস্তানি সেলোয়ার কামিজ।
আর বাঙালি পুরুষের পাকিস্তান প্রেমতো আরো একধাপ উপরে।
বাঙালি পুরুষ তার মায়ের ভাষাকে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে, অশ্রু শিক্ত নয়নে যে কাপড়টি পরে খালি পায়ে হাঁটে সেই পোশাকের নামটাই হচ্ছে "পাঞ্জাবি"।
শিট ক্যান নট বি এনি মোর ডাইরেক্ট দ্যান দ্যাট।
কাপড় ছেড়ে আবার শুধু ভাষায় ফোকাস করি।
বাঙালি তার গায়ে হলুদে যেই ভারতীয় গান গুলো ছেড়ে নাচে, কিংবা হিন্দি মুভির যে গানগুলো কল্পনা করে বাঙালি পুরুষ খেঁচে, তার অনেক বড় একটা অংশ হচ্ছে ভারতে বানানো উর্দু ভাষার গান।"
- শাফকাত রাব্বী অনীক