10/05/2024
হযরত সফওয়ান ইবনে উমাইয়াহ (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন সফওয়ান ইবনে উমাইয়ার কেনানা গোত্রীয়া স্ত্রী বাগুম বিনতে মুআদ্দাল (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করিলেন। কিন্তু স্বয়ং সফওয়ান ইবনে উমাইয়া পালাইয়া একটি পাহাড়ী ঘাঁটিতে আত্মগোপন করিলেন। সফওয়ানের সহিত তাহার ইয়াসার নামীয় গোলাম ব্যতীত আর কেহ ছিল না। তিনি গোলামকে বলিতে লাগিলেন, তোর নাশ হউক। দেখতো সামনের দিক হইতে কে আসিতেছে? গোলাম বলিল, ইনি ওমায়ের ইবনে ওহব (রাঃ)। সফওয়ান বলিলেন, ওমায়েরকে দিয়া কি করিব? খোদার কসম, সে নিশ্চয় আমাকে কতল করিবার উদ্দেশ্যেই আসিতেছে। সে তো আমার বিরুদ্ধে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে সাহায্য করিয়াছে। ইতিমধ্যে হযরত ওমায়ের (রাঃ) তাহার নিকট পৌঁছিয়া গেলেন। সফওয়ান বলিলেন, হে ওমায়ের, তুমি এ যাবৎ আমার সহিত যাহা কিছু করিয়াছ, তাহা কি যথেষ্ট হয় নাই? তুমি নিজের ঋণ ও পরিবার পরিজনের বোঝা আমার ঘাড়ে চাপাইয়াছ, তারপর এখন আমাকে কতল করিতে আসিয়াছ। হযরত ওমায়ের (রাঃ) বলিলেন, হে আবু ওহব, আমার প্রাণ তোমার জন্য উৎসর্গিত হউক। আমি মানবকুলে সর্বাপেক্ষা সদাচারী ও সৎসম্পর্ক স্থাপনকারী ব্যক্তির নিকট হইতে তোমার নিকট আসিয়াছি। হযরত ওমায়ের (রাঃ) ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমতে আরজ করিয়াছিলেন যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমার কাওমের সরদার নিজেকে সমুদ্রে ডুবাইয়া শেষ করিবার জন্য পালাইয়া গিয়াছে। সে এই আশঙ্কা করিতেছিল যে, আপনি তাহাকে নিরাপত্তা দিবেন না। আমার পিতামাতা আপনার উপর কোরবান হউক, আপনি তাহাকে নিরাপত্তা দান করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, আমি তাহাকে নিরাপত্তা প্রদান করিলাম।
হযরত ওমায়ের (রাঃ) সফওয়ানের সন্ধানে বাহির হইলেন এবং তাহার নিকট পৌঁছিয়া বলিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে নিরাপত্তা প্রদান করিয়াছেন। সফওয়ান বলিলেন, না, খোদার কসম, যতক্ষণ না তুমি তাঁহার নিকট হইতে এমন কোন চিহ্ন আনিবে যাহা আমি চিনিতে পারি, ততক্ষণ আমি তোমার সহিত কিছুতেই যাইব না। (হযরত ওমায়ের (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট যাইয়া ইহা ব্যক্ত করিলেন।) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, আমার পাগড়ী লইয়া যাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় প্রবেশের সময় যে চাদরখানি তাঁহার মাথায় বাঁধা ছিল উহা সেই ইয়ামানী চাদর ছিল। হযরত ওমায়ের (রাঃ) উহা লইয়া দ্বিতীয়বার সফওয়ানের সন্ধানে বাহির হইলেন এবং তাহার নিকট পৌঁছিয়া বলিলেন, হে আবু ওহব! আমি তোমার কাছে এমন ব্যক্তির নিকট হইতে আসিয়াছি যিনি সকল মানুষ অপেক্ষা উত্তম, সৎসম্পর্ক স্থাপনকারী, সকল মানুষ অপেক্ষা সদাচারী ও সর্বাপেক্ষা ধৈর্যশীল। তাঁহার মর্যাদা তোমারই মর্যাদা, তাঁহার সম্মান তোমারই সম্মান। তাঁহার রাজত্ব তোমারই রাজত্ব। তোমারই বংশের লোক। আমি তোমাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করাইতেছি। সফওয়ান বলিলেন, আমি নিজের ব্যাপারে কতল হইবার আশঙ্কা করিতেছি। হযরত ওমায়ের (রাঃ) বলিলেন, তিনি তোমাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়াছেন। যদি তুমি খুশীমনে তাহা গ্রহণ কর তবে তো কোন কথাই নাই, অন্যথায় তিনি তোমাকে দুইমাস সময় দান করিবেন। তিনি সর্বাপেক্ষা ওয়াদা পালনকারী ও সদাচারী। তিনি তোমার নিকট তাঁহার সেই চাদর প্রেরণ করিয়াছেন যাহা মাথায় বাঁধিয়া তিনি মক্কায় প্রবেশ করিয়াছিলেন। তুমি উহা দেখিলে চিনিতে পারিবে কি? সফওয়ান বলিলেন, হাঁ, চিনিতে পারিব। হযরত ওমায়ের (রাঃ) উহা বাহির করিলে সফওয়ান বলিলেন, হাঁ, ইহা সেই চাদর।
অতঃপর সফওয়ান ফিরিয়া আসিলেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পৌঁছিয়া দেখিলেন তিনি মসজিদে লোকদেরকে আসরের নামায পড়াইতেছেন। তাহারা উভয়ে অপেক্ষা করিতে লাগিলেন। সফওয়ান জিজ্ঞাসা করিলেন, মুসলমানগণ দিনে রাতে কতবার নামায আদায় করে? হযরত ওমায়ের (রাঃ) বলিলেন, পাঁচ বার। সফওয়ান জিজ্ঞাসা করিলেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ই কি তাহাদের নামায পড়ান? হযরত ওমায়ের (রাঃ) বলিলেন, হাঁ।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম ফিরাইবার পর সফওয়ান উচ্চস্বরে বলিলেন, হে মুহাম্মাদ, ওমায়ের ইবনে ওহব আমার নিকট আপনার চাদর লইয়া আসিয়াছে এবং বলিয়াছে যে, আপনি আমাকে আপনার নিকট আসিতে বলিয়াছেন। আমার ইচ্ছা হইলে আমি ইসলাম গ্রহণ করিব, অন্যথায় আপনি আমাকে দুই মাসের সময় প্রদান করিয়াছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, হে আবু ওহব, সওয়ারী হইতে নামিয়া আস। সফওয়ান বলিলেন, না, খোদার কসম, আগে আপনি স্পষ্ট করিয়া বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, বরং তোমাকে চার মাসের সময় দেওয়া হইল। এই কথা শুনিয়া সফওয়ান সওয়ারী হইতে নামিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সাহাবাদের সঙ্গে লইয়া) হাওয়াযেন গোত্রের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হইলেন। সফওয়ানও এই সফরে তাঁহার সহিত গেলেন। তিনি তখনও মুসলমান হন নাই। নবী করীম
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফওয়ানের নিকট লোক মারফৎ তাহার
যুদ্ধাস্ত্র ধার হিসাবে চাহিলে তিনি একশত লৌহবর্ম ও উহার সাজসরঞ্জাম
ধার দিলেন। ধার দিবার সময় সফওয়ান জিজ্ঞাসা করিলেন, আমি এই
যুদ্ধাস্ত্র স্বেচ্ছায় দিব না আপনি জোরপূর্বক নিবেন? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, তোমার নিকট হইতে ধার হিসাবে
লইতেছি যাহা ফেরৎ দেওয়া হইবে। সুতরাং বর্মগুলি ধার হিসাবে দিলেন।
অতঃপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশে বর্মগুলি
তিনি নিজেই আপন উটের উপর বহন করিয়া হুনাইনে গেলেন এবং
হুনাইন ও তায়েফের যুদ্ধে শরীক থাকিলেন। তায়েফের যুদ্ধ শেষে যখন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জেএররানায় ফিরিয়া
আসিলেন এবং ঘুরিয়া ঘুরিয়া গনীমতের মালামাল দেখিতেছিলেন তখন
সফওয়ানও তাঁহার সঙ্গে ছিলেন। সফওয়ান ইবনে উমাইয়া উট বকরী ও
উহার রাখাল দ্বারা পরিপূর্ণ জেএররানার পাহাড়ঘেরা ময়দানের দিকে
দেখিতে লাগিলেন এবং একদৃষ্টে ময়দানের দিকে চাহিয়া রহিলেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তাহাকে আড়চোখে
দেখিতেছিলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
বলিলেন, হে আবু ওহব। (গনীমতের মালামালে পরিপূর্ণ) এই ময়দান
কি তোমার পছন্দ হইতেছে? সফওয়ান বলিলেন, হাঁ। রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, এই ময়দান ও উহাতে যত
মালামাল আছে সবই তোমাকে দেওয়া হইল। (ইহা শুনিয়া) সফওয়ান
বলিলেন, নবী ব্যতীত আর কেহ এরূপ দানের হিম্মৎ করিতে পারে না।
অতঃপর সেখানেই কালিমায়ে শাহাদাৎ-
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ -
পাঠ করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিলেন। (কান্য) অপর এক রেওয়ায়াতে উমাইয়া ইবনে সফওয়ান নিজ পিতা সফওয়ান হইতে বর্ণনা করিয়াছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের যুদ্ধের সময় সফওয়ানের নিকট হইতে কিছু বর্ম ধার চাহিলে তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ, জোরপূর্বক নিবেন কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেন, বরং নিজ দায়িত্বে ধার হিসাবে লইতেছি। (অর্থাৎ নষ্ট বা হারাইয়া গেলে উহার ক্ষতিপূরণ দিব।) বর্ণনাকারী বলেন, কিছুসংখ্যক বর্ম যুদ্ধে হারাইয়া গিয়াছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই সকল হারানো বর্মের ক্ষতিপূরণ দিতে চাহিলে সফওয়ান বলিলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আজ তো আমার অন্তরে ইসলামের আগ্রহ জন্মিয়াছে। (সুতরাং আমি ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করিব না।)
(হায়াতুস সাহাবা ১ম খন্ড) ❤❤❤ ̇slam ❤️ #ইসলামিক #আল্লাহ #সাহাবী