01/12/2025
মিরপুর ১১-এর এই গলিটা রাতে সবসময় অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ থাকে।
মানুষ বলে, গলির মোড় থেকে একটু ভিতরে পুরানো এক চায়ের দোকানের পিছনে প্লাস্টিকের ভাগাড়ে নাকি “খবিশ” টাইপ কিছু দেখা যায়—
সে খবিশ আবার মানুষের কিছু খায় না…
শুধু মানুষের হাতে থাকা প্লাস্টিকের বোতল দেখে হিসহিস করে হাসে।
আমার কথা শুনে রাহাত ঠিক রাগ হল নাকি মজা পাইলো বুঝলাম না। মনে হল আমারে গালি দিতে গিয়াও কোন এক কারনে মুখ থেকে কিছু বের করলো না! আর এই যুগে ভূতটুত বিশ্বাস করা রীতিমতো হাস্যকর। আমার দিকে ঘুরে একরকম তাচ্ছিল্য করেই বলল রাহাত, “আরে ধুরও! ভূত-টূত নাই, আজাইরা সব। আর এরকম উদ্ভট গল্প কই থেকে পাস?”
রাহাতের তাচ্ছিল্য শুনেই ঠাস করে থেমে গেলাম। বুঝলাম চাপা কাজে লাগবেনা। কাজ-কাম না পাইলে এরম গল্প বানাইতে মজাই লাগে। বিশ্বাস হউক কি না হউক, টাইম পাস তো হয়! তবে পাবলিক না খাইলে গল্প ফেঁদে মজা নাই আসলে।
দিনে দুইটা চারটা প্রাইভেট, ক্লাস শেষ করে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা পার। আবার সেই সকালে বের হওয়া। মাঝে মাঝে বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা দেওয়ার সুযোগ হয়। আমার আবার বাইরে খাওয়া পরে বেশী। পেটে যে সমস্যা হয়না তা না। তবে বাড়ির খাবার চেয়ে আমার আগ্রহে থাকে হোসেন মামার ভাজা-পোড়া আর চটপটি, সাথে একটা কোল্ড ড্রিংকস, আর কি লাগে!
আম্মা তাও ঠেসে ঠুসে প্রতিদিন কিছু না কিছু দেয় ব্যাগে। বের করে আর দেখা হয় না যদিও প্রায়। এমনও হইছে ৬-৭ দিনের পচা গলা 'কলা' ব্যাগের তলদেশ থেকে বের করছি! ব্যাগটা দুইদিন রোদে শুকাইতে হইছে। ব্যাপারটা প্রথম ধরতে পারে সায়ান। ক্লাস ফোরের বাচ্চা। ক্লাস শেষ করে ওদের বাসায় গেছিলাম প্রাইভেট পড়াইতে। বলে, স্যারের গা দিয়ে গন্ধ বারায়! কি একটা অবস্থা! মান সম্মান নিয়ে টানাটানি লাগার আগেই দু'জন মিলে গন্ধের উৎস খুঁজে বের করি ব্যাগের ভেতর থেকে।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর ক্লাস-প্রাইভেট শেষে বাসায় ফেরার পথে রাহাতরে আর ফোনে পাইলাম না। ভাবছিলাম শুক্রবার ছুটি আছে, ধুমায়ে আড্ডা দিব। অগত্য একলাই হোসেন মামার ভাজা-পোড়া, চটপটি ইচ্ছামতো ঠুসে আয়েশি ভঙ্গিতে বাড়ীর দিকে হাঁটা ধরেছি। কিছু দূর আসতেই মনে হল বুকের মধ্যে একটু জ্বালাপোড়া হচ্ছে।একদম ইগনোর করে হাঁটা ধরলাম। আরও খানিকটা আসতে জ্বালাপোড়ার পরিমাণ তীব্রতর হল। একটু ঘাবড়ে গেলাম। মামা কি যে খাওয়াইলো! দাঁড়িয়ে গেলাম। এসিডিটির প্রবলেম মনে হয়। একটু পানি খেতে পারলে মনে হয় ভালো লাগতো। কিজানি মনে করে পিঠের ব্যাগ হাতড়াতে শুরু করলাম। গ্যাসের জ্বালা তীব্রতর হচ্ছে। ব্যাগ হাতড়াতে কিছু একটা ঠেকল। একটা হাফ লিটারের প্লাস্টিকের পানির বোতল। একটা আশা দেখলাম। বোতল বের করে চুমুক দিতে যাবো হঠাৎ 'ব্যাপার না! এরকমই হয়' খানিক পাশ থেকে কে যেন বলে উঠল। একটু ফিরে দেখার চেষ্টা করলাম, ঠিক বুঝলাম না। তবে একটা ভাগাড়ের ভেতর আবছা কেউ যেন বোতল টোকাচ্ছে বলে মনে হলো। লোকটার চেহারা অস্পষ্ট তবে বেশ বয়স্ক মনে হল। আমিও অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'মানে?' লোকটা উত্তর না করে খশখশ শব্দে বোতল টোকাতে লাগলো মনে হল। একটু ঘাবড়ে গেলাম। রাত গড়াচ্ছে। এমনিতে শুনশান জায়গা, অন্ধকার। তাছাড়া লোকটার অবয়বও অস্পষ্ট। হঠাৎ লোকটা বলে উঠল "মাইক্রোপ্লাস্টিক!"
আমি আরও অবাক হলাম। ভাবলাম বিজ্ঞানী টিজ্ঞানি নাকি! প্লাস্টিক দিয়ে কি বানাবে? লোকটা হুট করেই প্রশ্ন ছুইড়ে দিল, 'মাইক্রোপ্লাস্টিক খাস?'। তুই তুকারি শুনে একটু বিরক্ত লাগলো। তার চেয়ে অবাক হলাম প্রশ্ন শুনে। মাইক্রোপ্লাস্টিক আবার খাওয়া যায় নাকি? আমি সহজাতভাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়লাম অন্ধকারের দিকে, 'মানে?'। এবার একটু আফসোসের সুরে আওয়াজ এলো, 'এতো সব প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাস, কোক খাস, ঐ বোতলগুলাই আবার ধুয়ে মুছে ইউজ করিস, এগুলা যে ওয়ানটাইম বোতল জানিসনা?'। আজাইরা আলাপ শুনে একটু রাগ হল। বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'তো?'। 'আরে পাগলা! এই প্লাস্টিকের বোতলগুলা দিনে দিনে ক্ষয় হয়, আর এর মধ্যে প্রতিদিন পানি রাইখে আমরা খাই। এই প্লাস্টিক ক্ষয় হয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক হিসেবে পানি, কোল্ডড্রিংকসের সাথে মিইশে যায়। পানি দিয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক খাইতে খাইতে একদিন নাই হয়ে যাবি।' কথা শুনে হুট করে বোরহান চাচার কথা মনে পড়ল। গত বছর মারা গেছেন হার্ট এটাকে। বয়স কিন্তু বেশী ছিল না। চাচা যখন হাসপাতালে, সাথে থাকার মত তেমন কেউ ছিলনা তখন। একবার তাই আমাকে দু'রাত কাটাইতে হইছিল হসপিটালে। ডাক্তার বলছিল, হার্টে মেজর প্রবলেম। রক্তে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকায় হার্টের সমস্যা ধরা পড়ছিল। মৃত্যুর কিছুদিন আগ থেকে খুব স্ট্রাগল গেছে তার। মনের অজান্তেই বলে উঠলাম, 'এখন উপায়?'
তৎক্ষণাৎ মনে হল সেই অবয়বটা খুবই কাছে চলে আসছে। মুখটা কেমন স্বচ্ছ, প্লাস্টিকের মতো লাগে। উদ্ভট মুখের গড়ন! মুখ দিয়ে লালা ঝড়ছে, মনে হল কিছু খাচ্ছিলো। আমার হাতে পানির বোতল দেখে কেমন এক অশরীরী হাসি দিল। ঠিক যেন খবিসের মতো! আমার মাথায় কিছু খেলছিল না। কিছু না ভেবেই সর্বশক্তি দিয়ে দিলাম দৌড়! পিছনে ফিরে তাকানার আর সাহস হলনা। বাসায় ঢুকেই ব্যাগ ফেলে ফ্যান ছেড়ে বসলাম। গা দিয়ে ঘাম ঝরছে। আম্মা হম্বিতম্বি করে এলো, 'কি রে কি হইছে? হাপাস ক্যান?' অস্থির মুখে মাথা নিচু করে বসে থাকলাম। আম্মা ব্যাগ হাতড়ায়ে বলল, 'বোতল আবার হারাইছিস? বাড়িতে কি বোতলের গাছ আছে? তোর ছোটডাও সেদিন কই যেন বোতল থুয়ে আইছে। প্লাস্টিকের বোতল টোকায়ে বিক্রি করিস নাকি তোরা?' এবার মুখ তুলে আম্মার দিকে তাকালাম, 'ঐ বোতল আর দেওয়ার দরকার নাই। কালকে দুইটা ভালো বোতল কিনে আনবো। আর প্লাস্টিকের বোতলে পানি রাখা, খাওয়া বাদ দেও। কাঁচের জগে রাখবা এখন থেকে। এগুলা ভালোনা। মানুষ মারা যাইতেছে...'