28/08/2026
**বর্ষার ঘাটশিলা **
প্রথম পর্ব
আজ আমি আপনাদের নিয়ে যাবো এমন এক জায়গায়, যেখানে আছে "পাহাড়, ঝর্ণা, হ্রদ, জঙ্গল,নদীর বাঁধ,দেবদেবীর মন্দির আর আছে বর্ষায় উত্তাল সুবর্ণরেখা নদীর সর্বত্র উপস্থিতি এবং পথের পাঁচালী, অপুর সংসার, অপরাজিত,চাঁদের পাহাড়, আদর্শ হিন্দু হোটেল এই রকম সব কালজয়ী উপন্যাস এর লেখক বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক শ্রী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতিবিজড়িত এই শহরটি বাঙালিদের কাছে এক জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।" অতীতেও বাঙালিরা এখানে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য ('হাওয়া বদল') আসতেন। এখানকার স্থানীয় মানুষের মুখে বাংলা ভাষার বহুল প্রচলন রয়েছে।
এবার নিশ্চই আপনারা বুঝতে পেরেছেন আমি কোন শহরের কথা বলছি l
হ্যাঁ ঠিক ধোরেছেন, এটা হচ্ছে ঝাড়খন্ডের পূর্ব সিংভুম জেলার সুবর্ণরেখা নদীর তীরে অবস্থিত কলকাতা থেকে মাত্র ২১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এক সুন্দর ও শান্ত শহর ঘাটশিলা। এখানে বেশিরভাগই সহজ সরল আদিবাসী মানুষের বাস l
আমরা হাওড়া থেকে সকাল ৬.২০ মিনিটের বার্বিল জনশতাব্দী এক্সপ্রেস (১২০২১) করে ঘাটশিলাতে ৯.০১ মিনিটের পরিবর্তে ৯.৪০ মিনিট নাগাদ এসে পৌঁছেছিলাম l
এখানে আমাদের জন্য স্টেশন এর বাইরে অটো নিয়ে অপেক্ষা করছিলো মুজাফর ভাই (ফোন নং ৭৮৭০৮৭৮৯৮৬)l সেই অটো করে আমরা চলেগেলাম আমাদের আগে থেকে বুকিং করা হোটেলে(বিভূতি ইন -ফোন নং-৯৮৩৬০৪৭৮১০), সেখানে একটু ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে পড়লাম প্রথম দিনের সাইটসীয়িং করতে l
প্রথমে গেলাম ফুলডুংরি টিলা (Phuldungri Hill) ঝাড়খণ্ডের ঘাটশিলা শহরের একটি সুন্দর ও ছোট পাহাড়ি টিলা। এটি শাল, মহুয়া ও নানা গাছে ঘেরা। এখান থেকে পুরো ঘাটশিলা শহরের সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। বিখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি ও লেখার সঙ্গে এই জায়গার গভীর মিল আছে। 'চাঁদের পাহাড়' নাকি লেখক এই জায়গার উপর ভিত্তি করে লিখেছিলেন l
তার পর গেলাম বুরুডি লেক (Burudi Lake) একটি অত্যন্ত সুন্দর এবং শান্ত কৃত্রিম হ্রদ, যা বুরুডি বাঁধ বা ড্যাম তৈরির ফলে সৃষ্টি হয়েছে। এটি ঘাটশিলা শহর থেকে প্রায় ৯ কিমি দূরে ডালমা পাহাড় ও জঙ্গল ঘেরা প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত। এখানে বোটিং করানো হয় l কিন্তু বর্ষা কাল হওয়ার দরুন এখন বোটিং বন্ধ আছে l এখানে আমরা লাঞ্চ এর অর্ডার করে চলে যাই আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ডালমা পাহাড়ের কোলে অবস্থিত ধারাগিরি জলপ্রপাত (Dharagiri Waterfalls) একটি সুন্দর ও শান্ত প্রাকৃতিক স্থান । বুরুডিহ হ্রদ থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে ঘন জঙ্গল ও পাথুরে রাস্তার মাঝে প্রায় ২১ ফুট উঁচু এই ঝরনাটি প্রকৃতি প্রেমীদের জন্য এক চমৎকার ও রোমাঞ্চকর গন্তব্য।
এর কাছাকাছি প্রধান আদিবাসী গ্রাম হলো বাসাদরা (Basadera) এবং হেনদালজুড়ি (Hendaljuri) l আমরা রতন(লোকাল একজন অল্প বয়সী আদিবাসী গাইড) কে সঙ্গে নিয়ে গভীর জঙ্গল এবং পাথুরে রাস্তা দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ ২০ মিনিট হাঁটার পর যখন ধারাগিরির সামনে পৌঁছলাম সে এক দারুন অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না l ফেরার পথে ওখানকার আদিবাসী বাচ্চাদের আমাদের নেওয়া কিছু বিস্কুট আর চকলেট সবাইকে দিলাম এবং এতে ওরা ভীষণ খুশী হয়েছিলো l
এর পর আমরা বুরুডি লেকে এসে আগে থেকে অর্ডার করা দেশী মুরগির ঝোল আর ভাত খেয়ে রওনা হলাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য চিত্রকূট পাহাড় বা ছোট টিলা নামেও পরিচিত (Chitrakoot Pahar) ঘাটশিলাশহর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ছোট, মনোরম পাথুরে পাহাড় । এর চূড়ায় একটি পূজনীয় শিব মন্দির যা হিন্দু দেব-দেবীর চিত্র এবং একটি স্বতন্ত্র নন্দী ষাঁড়ের মূর্তি দ্বারা সজ্জিত রয়েছে এবং এখান থেকে চারপাশের সবুজ প্রকৃতি, স্থানীয় খেত ও ঘাটশিলার ভূদৃশ্যের ৩৬০-ডিগ্রি প্যানোরামিক দৃশ্য দেখা যায় । এরপর আমরা গেলাম সুবর্ণরেখা নদীর পার (Subarnarekha River) এখান থেকে সূর্যাস্ত খুব সুন্দর দেখা যায় l এরপর গেলাম সুবর্ণরেখা নদী ও পাহাড়ি অঞ্চলের কোলে অবস্থিত মা রঙ্কিনী মন্দির (Rankini mata mandir) একটি বিখ্যাত ও জাগ্রত কালীপীঠ l অবশেষে আজকে আমাদের শেষ গন্তব্য ছিল ঘাটশিলার গোপালপুরে সুবর্ণরেখা নদীর তীরে একটি শান্ত ও সুন্দর পরিবেশে অবস্থিত সূর্য মন্দির(Surya Mandir) l সাদা মার্বেল ও লাল বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত, ১৮টি চাকা ও সাতটি ঘোড়া বিশিষ্ট এক বিশাল রথের আদলে এটি তৈরি। এখানে সূর্যের একটি বিশাল গর্ভগৃহ মূর্তি রয়েছে এবং সংলগ্ন নদীর তীর থেকে সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়।এরপর আমরা হোটেলে ফিরে এসে রাতের খাবার খেয়ে শুয়েপড়ি l
আজকের খরচ -(৩ জনের ) ট্রেন ভাড়া (এসি চেয়ারকার) ৪৪০x৩= ১৩২০,অটো ভাড়া -১০০০ (লোকাল সাইট সীয়িং),
হোটেল ভাড়া -১৩০০ (দিনপ্রতি),
দুপুরের খাওয়া -৪৩০,
প্রাণীয় জল-৭০(৫ লিটার)
চা -৩০
মোমো -৭০
রাতের খাবার -১৬২
আজকের মোট খরচ -৪,৩৮২
চলবে...........