23/12/2023
#কিছুক্ষণ_আরো
পর্ব-৯
(১০)
নুঙ্গী ছাড়ার পর ট্রেনটা এখন একেবারেই ফাঁকা হয়ে গেছে। এমনিতে অফিস টাইম ছাড়া এ লাইনে খুব একটা ভিড় হয় না, তার উপর রাতের ট্রেন। নুঙ্গী ছাড়ার পর আর লোক নেই বললেই চলে। যে কজন রয়েছে তারাও নিজেদের মধ্যেই মগ্ন। ভাবনায় ছেদ পড়তে সিধু দেখলো একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক ওদের দিকে কেমন অদ্ভুতভাবে বারবার তাকাচ্ছে। ব্যাপারটা ও প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছে যদিও। তবে বিশেষ পাত্তা দেয়নি। কিন্তু এখন ওর একটু অস্বস্তিই হচ্ছে। যথেষ্ট রাত হয়েছে। তার মধ্যে এরম ফাঁকা ট্রেন, সাথে আবার মুনও রয়েছে। লোকটা মনে মনে কোনো কুমতলব আঁটছে না তো? ভাবতে ভাবতে মুনকে আরেকটু শক্ত করে ধরল। ভাবটা এমন যেন, আমি আছি ওর সঙ্গে, যতই যাই ভাবো বাছাধন তুমি কিচ্ছুটি করতে পারবে না। আকস্মিক এমন হাতের চাপে মুনের ঘুমটা ভেঙে গেল। ঘুম জড়ানো চোখে জিজ্ঞেস করলো,
—কোন স্টেশন এলো রে?
—এই তো বজবজ ঢুকছে।
সিধু একটু চাপা স্বরেই উত্তর দিল।
—এসেই তো গেল। ডাকিসনি কেন আমায়?
—তুই যে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলি। ডাকতে মন চাইলো না...
—অসাধারণ! ট্রেন থামার পরও যদি আমার ঘুম না ভাঙতো?
—আরেকবার নাহয় দুজনে শিয়ালদা থেকে ঘুরে আসতাম...
—সেই... কে যেন একটু আগে "বড়ো" হওয়ার কথা বলছিল!
দুজনেই একসাথে হেসে ফেলে।
ট্রেনটা আস্তে আস্তে স্পিড কমাচ্ছে। চিত্রিগঞ্জ মসজিদের সামনে একটা ছোটো মতো স্টেজে কয়েকটা ছেলে উঠে বক্স বাজিয়ে নাচানাচি করছে। জানলা দিয়ে আসা ফুরফুরে ঠান্ডা হাওয়ায় কেমন যেন টান ধরছে চামড়ায়। রোমকূপেরা জানান দিচ্ছে শীত আসছে...
(১১)
সার্কুলার রোডের এদিকটা বেশ শান্ত মতন। ছুটন্ত গাড়ির শাঁইশুঁই শব্দ ছাড়া তেমন কোনো কোলাহল নেই এখানে।
—আমরা দুজনেই একসাথে যে এইভাবে ইউনিভার্সিটির মেন ক্যাম্পাসেই চান্স পেয়ে যাবো জাস্ট কল্পনাও করিনি জানিস তো! তার উপর দুজনেই কোর সাবজেক্টই পেলাম... আহ! নাউ আই ফিল লাইক মাই ড্রিম কামস্ ট্রু! থুড়ি আওয়ার ড্রিম।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু হাঁপাচ্ছে চন্দ্রাবলী। সিদ্ধার্থ জলের বোতলটা এগিয়ে দিলো ওর দিকে। ঢকঢক করে প্রায় এক বোতল জলই শেষ ফেলল। এখন নিজেই দাঁত বের করে বলছে
—সরি ভাইটু প্রচন্ড তেষ্টা পেয়েছিল রে।
এতক্ষণ অবধি সিদ্ধার্থ একটাও কথা বলেনি। চুপচাপ চন্দ্রাবলীর রকমসকম দেখছিল আর মুচকে মুচকে হাসছিল। কিন্তু "ভাইটু" শব্দটা শুনে ওর মাথার তারটা গেল ফটাস করে কেটে।
—কি, কি, কি বললি! আমি তোর ভাইটু?
সিদ্ধার্থর মুখটা দেখার মতো হয়েছে। চন্দ্রাবলী হেসে গড়িয়ে পড়ল। তাও অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল
—আচ্ছা বাবা সরি সরি। আর এমন ভুল হবে না, ভাইটুউ...
বিশাল বজ্জাত মেয়ে। খুব ভালো করে জানে সিদ্ধার্থকে কিভাবে ইরিটেট করতে হয়।
—এই সিধু শোন না, মা কল করেছিল। কাউন্সেলিং হলে ছিলাম, তাই তখন আর রিসিভ করতে পারিনি। আমি মাকে খবরটা দিয়ে দিই বুঝলি।
—বেশ, তুই কথা বল, আমি একটু ভেতর থেকে আসছি। ছোট্ট কটা কাজ বাকি আছে।
সিদ্ধার্থ চলে যায়। চন্দ্রাবলীও ওর বাড়িতে ট্রাই করতে শুরু করে। মনে মনে ভাবে, যাক! এবার হয়ত মাকে খুশি করতে পারবে ও। আর হয়ত বাবা বলবে না যে ওর দ্বারা কিচ্ছু হবে না।
—মুন...
সিদ্ধার্থ আবার কখন যেন এসে দাঁড়িয়েছে।
—কিরে ফিরে এলি?
—তোকে আরেকটু দেখে যেতে ইচ্ছে করল। তাই...
শোন না, এখানেই থাকিস কিন্তু, এদিক ওদিক চলে যাস না আবার। এখানের সেরম কিছু চিনি না আমি। খুঁজে পাবো না তোকে।
মুন মৃদু হাসে। একদৃষ্টে তাকায় সিধুর চোখের দিকে। আর যে যাই করুক এই ছেলেটা যে ওকে ছাড়া বেশিদিন বাঁচবে না, তা যেন অন্তরআত্মা দিয়ে অনুভব করতে পারে চন্দ্রাবলী।
—না রে পাগলা। তোকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না আমি। তুই যা। আর তাড়াতাড়ি ফিরে আয়। হাত দিয়ে ও ওর সিধুর চুলগুলো অল্প ঘেঁটে দেয়। সিদ্ধার্থ এগিয়ে যায় লিফটের দিকে। চন্দ্রাবলীও ওর মাকে ট্রাই করতে থাকে। প্রথমে তো ফোনটা লাগতেই চাইছিল না। নেটওয়ার্ক প্রবলেম। অতঃপর বেরিয়ে রাস্তার এপারে আসতে যাও বা ফোনটা লাগল কিন্তু বারবার ট্রাই করার পরেও মা ফোনটা তুলছে না। হয়ত কোনো কাজে ব্যস্ত। কিন্তু চন্দ্রাবলীরও আর তর সইছে না। আরো দু'বার ট্রাই করার পরে ওর মা ফোনটা তুলল।
—হ্যালো মা জানো...
—কি হয়েছে কি তোর এতবার ফোন করছিস কেন? বাড়িতে মামারা এসেছে তাদের খাবার বাড়ছি আর তার মধ্যে তুই... ঝাঁঝিয়ে ওঠে ওর মা।
চন্দ্রাবলী একটু থতমত খেয়ে যায়। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলে
—আরে মা জানো আমি না ইউনিভার্সিটি মেন ক্যাম্পাসে চান্স পেয়ে গেছি।
—ওহ্! তাই বল... আমি ভাবলাম কি না কি! এই তোর বাবা ভাত চাইছে, আমি যাই।
কট্ করে ফোনটা কেটে দেয় মা ওর মুখের ওপর। মায়ের এমন উদাসীন ব্যবহারে মনটা খারাপ হয়ে যায় চন্দ্রাবলীর। মূহুর্তেই ওর সমস্ত আনন্দ যেন মলিন হয়ে আসে। অনুভব করে গলার কাছে কিছু একটা যেন জমাট বাঁধছে। মা-কে কি আর কোনোদিনই সন্তুষ্ট করতে পারবে না ও?
না হয়ত। এটাই বুঝি শেষ চেষ্টা ছিল।
অন্যমনস্কভাবে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ও রাস্তার মাঝখানে এসে পড়েছে খেয়ালই করেনি। যখন খেয়াল হলো ততক্ষণে অনেকটা দেরী হয়ে গেছে। ওদিক থেকে ছুটে আসা ট্রাকটা মুহূর্তের ব্যাবধানে পিষে দিয়ে চলে গেল চন্দ্রাবলীকে। প্রাণটা কিছুক্ষণ ধুকধুক করে কয়েক সেকেন্ড পর নিস্তেজ হয়ে গেল।
সিদ্ধার্থ যতক্ষণে এলো, ততক্ষণে একটা ছোটোখাটো জটলা পেকে গেছে রাস্তার ধারে। শেষবার যেখানে চন্দ্রাবলীকে দাঁড়াতে বলে গেছিল, সেখানে ও নেই। এদিক ওদিক কোথাও নেই। কৌতূহলবশত ও জটলাটার কাছে গেল। চারিদিকে চাপ চাপ রক্ত, মধ্যিখানে ওর খুব চেনা সেই কাজল-চোখের মেয়েটা।
এরপর ওর আর কিছু মনে নেই। দুদিন পর জ্ঞান ফিরতে দেখেছিল ও হসপিটালের বিছানায় শুয়ে। কে বা কারা নিয়ে গেছিল জানে না।
এম.এস.সি-টা তারপর আর করা হয়নি।
কলমে : সৌমিতা
পোষ্টার ডিসাইন : রন্
C/o কলিকাতা
িকাতা