28/04/2026
বিতর্ক ও বিভ্রান্তি (৫৭১)
সাবধান! সাবধান!
এই মুহূর্তে বাংলার অধিকাংশ মানুষ বলছেন, এস আই আর এখন আর প্রশাসনিক পরিভাষা নয়। একটি ত্রাসের নাম। একটি আতঙ্কের নাম। একটি গভীর চক্রান্তের নাম। একটি নিপীড়নের নাম। একটি অন্যায়ের নাম। একটি বিভীষিকার নাম। লক্ষ লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে একটি অঘোষিত যুদ্ধের নাম।
আমাদের মধ্যে যাদের সামান্যতম কমনসেন্স আছে। এক আধটু জ্ঞান আছে। সামান্য ন্যায়বোধ আছে। যারা ঘৃণা ও বিদ্বেষ মুক্ত। যারা গ্রাউন্ড রিয়ালিটি বিষয়ে অবহিত তারা জানেন, তথাকথিত এস আই আর কত অর্থহীন একটি অনুশীলন! ফিউটাইল এক্সারসাইজ! পরিতাপের বিষয়, যারা গজদন্ত মিনারে বসে অলীক কল্পনায় বিভোর তাদেরকে বোঝাতে বারবার আদ্যোপান্ত ঘটনা উল্লেখ করতে হয়। ইনিয়ে বিনিয়ে বর্ণনা করতে হয়। কিন্তু ভুক্তভোগীদের কাছে এসব আলোচনার পুনরাবৃত্তি ও ইতিবৃত্ত বর্ণনা খুব বিরক্তিকর। এটা সুদূর অতীতের কোন ঘটনা নয়। আবার ভবিষ্যতে সংঘটিত হতে পারে এমন কোন আশঙ্কা নয়। বর্তমান ঘটে চলেছে। ব্যাপক তার চর্চা হচ্ছে। প্রতিবাদ হচ্ছে। এসব দেখে, আমাদের প্রজন্মের মানুষের চোখ খুলে গেছে। ব্রিটিশ বিরোধী মুক্তি আন্দোলন পড়ে উপভোগ করেছি। তার মর্ম হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারিনি। এখন বুঝতে পারছি, একটি ফ্যাসিবাদী সরকার কীভাবে নিরীহ নাগরিকদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে! জীবন মরণ লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করে!
আজকে গতানুগতিক আলোচনা থেকে সরে এসে বিপরীত মেরু থেকে ঘটনাটা আলোকপাত করব। আপনারা সকলেই জানেন, যেসব মানুষ বিনা কারণে ইতিমধ্যে এস আই আর নামক চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। তাদের বক্তব্য না শুনে এবং তাদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট সকল তথ্য না নিয়ে তাদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। অন্যায় ও নীতিহীন পদ্ধতিতে তাদের নাম ভোটার তালিকা থেকে অবলুপ্ত করা হয়েছে। এসব হতভাগ্যদের কে বোঝাবে যে অজান্তেই তারা এক গভীর খাদে পতীত হয়েছে! তারা এখনো নির্বিকার! কেউ বলছে, এসব কিচ্ছু হবে না। ভোটের পর এমনি এমনি ঠিক হয়ে যাবে। কেউ বলছে, পার্টি নেতারা বলেছে, এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। তারা ঠিক করে দিবে। এমনকি তারা সতর্ক করে দিচ্ছে, এসব নিয়ে সংগঠিত হওয়া অথবা আন্দোলন করা তারা সহ্য করবে না। ফলে, এস আই আর বিভীষিকার শিকার মানুষ এখনো নির্বিকার। আবার রাস্তায় নামা কত বিপজ্জনক হতে পারে, সেটা মালদহ কান্ড চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
তাহলে এখন কী হবে? বস্তুত ফ্যাসিবাদী শক্তি এপর্যন্ত একশো শতাংশ সফল। তারা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। দ্বিতীয়, ফ্যাসিবাদী শক্তি বিরোধী লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রবেশকারী বলে দেগে দিতে সক্ষম হয়েছে। তৃতীয়, তারা এখন মেরুকরণের নতুন ও কার্যকর হাতিয়ার অর্জন করেছে। চতুর্থ, তারা সুদূরপ্রসারী একটি এজেন্ডা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। এই এজেন্ডা সামনে রেখে একাধিক নির্বাচনে তারা মাৎ করে দিবে। আমাদের প্রতিবেশী ও সহনাগরিক ভাইদের ভুল বোঝাতে সক্ষম হবে।
এখন আমাদের উদ্বেগ, এস আই আর নামক বিভীষিকার শিকার লক্ষ লক্ষ মানুষকে নিয়ে। তারা কেউ আমাদের ভাই, কেউ আমাদের বোন, কেউ আমাদের পিতা অথবা মাতা, কেউ আমাদের চাচু, কেউ আমাদের চাচীমা, আবার কেউ আমাদের সন্তান। প্রায় প্রতিটি পরিবারে কেউ না কেউ এই ভয়ঙ্কর চক্রান্তের শিকার। একেবারে হিসেব করে। এই বিভীষিকার চুড়ান্ত পরিণতি কোথায় দাঁড়াবে, আমরা কেউ জানি না। এ যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! এসব হতভাগ্য মানুষের কাছে এখন এই প্রশস্ত জগৎ সংকুচিত হয়ে আসছে। তারা এদেশের বৈধ নাগরিক না হলে, পৃথিবীর কোন দেশ তাদের গ্রহণ করবে? কেন গ্রহণ করবে? কী প্রমাণ আছে যে তারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে? মায়ানমার থেকে এসেছে?
খুব উদ্বেগের বিষয়, আমাদের সমাজের এক শ্রেণির নির্বোধ কিছু না জেনে এই বিভীষিকাকে অস্বীকার করে চলেছে। তারা বলে চলেছে, এসব কিচ্ছু হবে না! সব ঠিক হয়ে যাবে। এসব মন্তব্যের পিছনে শক্তিশালী যুক্তি ও প্রজ্ঞা থাকলে খুব খুশি হতাম। কিন্তু না, এসব মন্তব্য তাদের হঠকারী চরিত্র উন্মোচন করে। এসব তাদের অশিক্ষিত গডফাদারদের শেখানো বুলি। কোন ভিত্তি নেই। আবার হতে পারে, হতাশা থেকে নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার জন্য অথবা সাময়িক সান্ত্বনা পেতে এসব আওড়াচ্ছে!
খুব সিরিয়াসলি বলছি, যারা এদেশের বৈধ নাগরিক এবং বৈধ ভোটার। তা সত্ত্বেও, তাদের নাম ডিলিট করা হয়েছে। তাদেরকে অনুরোধ করছি, খুব শীঘ্রই সংগঠিত হোন। বিষয়টি প্রতিদিন জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ইতিমধ্যে, প্রশাসনিক প্রতিকারের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, দেশের উচ্চতর আদালত বিষয়টির সহজ সমাধান না করে আরও জটিল করে তুলেছে! যে এস আই আর একটি স্বাভাবিক ও সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম তাকে কোর্টের আওতায় ফেলে সব ঘেঁটে দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, বিচারের নামে এসব কী হচ্ছে! বিচারের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থা ধ্বংস করা হচ্ছে! সত্য বলতে কি, আগামী দিনে ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া ও ট্রাইব্যুনাল উত্তর বিচার প্রক্রিয়া কত জটিল হবে, সেসব বলে আপনার ঘুম হারাম করতে চাই না। উনিশটি ট্রাইব্যুনাল বেঞ্চ নিয়মিত কাজ করলেও এক প্রজন্মে এই কাজ সম্পন্ন হবে না। মহামান্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিরা দিন রাত এক করে এই বিভীষিকার সমাধান করতে আগ্রহী হবেন না। তাদের শরীর ও মন সাপোর্ট দিবে না। এখন এসব আর আশঙ্কা নয়, বাস্তব। উট পাখির মতো বালিতে মাথা গুঁজে দিলে বিপদ এড়ানো যাবে না।
এই পরিস্থিতিতে আমাদেরকে মুক্তির পথ খুঁজে বের করতে হবে। গভীর অনুসন্ধানের পর, আমাদের মনে হয়েছে, দুটি পথ এখনো উন্মুক্ত আছে। এক. আইনি পথে সমস্যার সুরাহা খুঁজতে হবে। যদিও এপথে কবে সমাধান হতে পারে কেউ জানেন না। কিন্তু এপথে এখন হাঁটতেই হবে। দুই. গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। এপথ খুব মসৃন নয়। তবে এদেশে এখনো গণতন্ত্র মুমুর্ষ অবস্থায় বেঁচে আছে। এজন্য আন্দোলন ফলপ্রসূ হওয়ার সম্ভাবনা আছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা সনাতনী পথ ও পন্থা। পৃথিবীর সকল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে মানুষ আন্দোলন করে সফলকাম হয়েছে।
খুব গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ, আমাদের মধ্যে যাদের নাম অ্যাডজুডিকেশনের পর ডিলিট হয়েছে তাদেরকে পাড়ায় পাড়ায় ও গ্রামে গ্রামে একটি একটি করে সংগঠন গড়ে তুলতে হবে। দশজন থেকে একশো জন বা তারও বেশি সদস্য নিয়ে সংগঠন গড়ে তুলুন। সংগঠনের অভিন্ন নাম হবে। সেই নামের সঙ্গে শুধু স্থানের নাম যোগ করে দিন। যেমন, কনুটিয়া ডিলিটেড ভোটার সংগ্রাম কমিটি। রামপুরহাট ডিলিটেড ভোটার সংগ্রাম কমিটি। সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো নিয়ে ব্লক, মহকুমা ও জেলা স্তরে কমিটি গঠন করতে হবে। প্রতিটি জেলা কমিটির দায়িত্বশীলদের নিয়ে রাজ্য কমিটি কাজ করবে। সকল ডিলিটেড ভোটার স্থানীয় কমিটির সদস্য হবে। প্রতিটি কমিটি একটি করে মাস পিটিশন লিখে স্থানীয় বিডিও, এসডিও, ডিএম এবং কোলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে দিবেন। সেই সঙ্গে এসব তৎপরতা সামাজিক গণমাধ্যমে ভাইরাল করতে হবে।
সাবধান! এসব পরিকল্পনাকে ভাবনা ও কল্পনা স্তরে রেখে মাসের পর মাস অপেক্ষা করলে সব কিছু হাতের বাইরে চলে যাবে। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। শুধু উপদেশ দিয়ে ঘরে বসে থাকলে হবে না। সকলকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হবে। নিজের যোগ্যতা ও পজিশন অনুযায়ী কাজ ভাগ করে নিতে হবে।
লেখক নুরুল ইসলাম।